নাটোরে মা-ছেলে একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন মা-ছেলে।

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাটোরের লালপুর উপজেলার একটি সাধারণ পরিবার এখন সারা দেশের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, দারিদ্র্য, সংসারের দায়ভার আর সামাজিক কটূক্তি পেরিয়ে ৪০ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষার হলে বসেছেন ফুলঝড়ি বেগম। আর সবচেয়ে আবেগঘন বিষয় হলো— তার পাশের সারিতেই পরীক্ষার্থী হিসেবে বসেছেন নিজের ছেলে মনিরুল ইসলাম। মা-ছেলের একসঙ্গে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার এই ঘটনা এলাকায় যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রশংসায় ভাসছে পরিবারটি।

নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ফুলঝড়ি বেগমের জীবনটা কখনোই সহজ ছিল না। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তার পড়াশোনার পথ থেমে যায়। শৈশবের বই-খাতা বদলে হাতে উঠে আসে সংসারের দায়িত্ব। একসময় সন্তান লালন-পালন, রান্নাঘর, পরিবারের টানাপোড়েন আর অর্থকষ্টের মাঝেই কেটে যায় জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু মনের ভেতর কোথাও একটি স্বপ্ন রয়ে গিয়েছিল— একদিন অন্তত পরীক্ষার হলে বসবেন, নিজের নাম লিখে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবেন।

সেই বহুদিনের স্বপ্নই এবার বাস্তবে রূপ নিয়েছে। মোহরকয়া নতুনপাড়া মাধ্যমিক কারিগরি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি চলতি বছর এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তার ছেলে মনিরুল ইসলামও। বর্তমানে তারা উপজেলার মধুবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছেন।

পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে মা-ছেলেকে একসঙ্গে দেখে কৌতূহলী হয়ে উঠছেন অনেকে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ অভিনন্দন জানাচ্ছেন, আবার কেউ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকছেন। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, এমন দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে যেখানে নারীদের শিক্ষাজীবন অনেক সময় বিয়ের পরই থেমে যায়, সেখানে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আবার পরীক্ষার হলে ফেরা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত।

ফুলঝড়ি বেগম বলেন, ছোটবেলায় তারও অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু পারিবারিক বাস্তবতায় সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সংসার আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তেই জীবনের বেশিরভাগ সময় পার হয়ে গেছে। তবুও ভেতরে ভেতরে একটা ইচ্ছা সবসময় কাজ করত— একদিন অন্তত এসএসসি পরীক্ষার অভিজ্ঞতা নেওয়া। ছেলে ও পরিবারের উৎসাহেই এবার তিনি সেই সাহস পেয়েছেন।

তিনি জানান, গ্রামের অনেকেই বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। কেউ হাসাহাসি করেছে, কেউ কটূক্তিও করেছে। কিন্তু তিনি সেসব কথায় থেমে যাননি। বরং নিজের স্বপ্ন পূরণ এবং সন্তানদের সামনে উদাহরণ তৈরি করাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। তার ভাষায়, “মানুষ নানা কথা বলবেই, কিন্তু আমি মনে করি শেখার কোনো বয়স নেই। আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

ছেলে মনিরুল ইসলামও মায়ের এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। সে জানায়, মায়ের সঙ্গে একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে পারা তার জন্য গর্বের বিষয়। ছোটবেলা থেকেই মায়ের কষ্ট দেখেছে সে। সংসারের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যেভাবে মা তাদের বড় করেছেন, তা তাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে। এখন মাকে বই হাতে পড়তে দেখে তার নিজেরও পড়াশোনার আগ্রহ আরও বেড়েছে।

পরিবারটির আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল নয়। ফুলঝড়ি বেগমের স্বামী নজরুল ইসলাম কখনো ভ্যান চালান, কখনো দিনমজুরের কাজ করেন। সামান্য আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে স্ত্রী ও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও তিনি স্ত্রীকে শিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন।

নজরুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষিত মা একটি শিক্ষিত সমাজ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই স্ত্রীর ইচ্ছাকে তিনি কখনো ছোট করে দেখেননি। কষ্ট করে হলেও তিনি চান, তার স্ত্রী আরও পড়াশোনা করুক এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক। তার বিশ্বাস, পরিবারের একজন নারী শিক্ষিত হলে পুরো পরিবারই আলোকিত হয়।

ফুলঝড়ি বেগমের বড় মেয়েও পরিবারের এই সংগ্রামী ইতিহাসের অংশ। তিনি ইতোমধ্যে নার্সিং শেষ করে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করছেন। পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, মেয়ের সফলতা এবং সন্তানদের উৎসাহই ফুলঝড়ি বেগমকে নতুন করে পড়াশোনায় ফেরার সাহস দিয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষা সংশ্লিষ্টরাও ঘটনাটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এখনো বহু নারী অল্প বয়সে বিয়ের কারণে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। অনেকেই পরে আর পড়াশোনায় ফিরতে পারেন না। সেখানে ফুলঝড়ি বেগমের এই উদ্যোগ অন্য নারীদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার করবে।

লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, বরং নারী শিক্ষা ও আজীবন শিক্ষার এক অনন্য উদাহরণ। বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না— ফুলঝড়ি বেগম সেই সত্যকেই সামনে এনেছেন। তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে তার পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার বাড়লেও এখনো গ্রামীণ পর্যায়ে অনেক নারী নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়েন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বয়স্ক শিক্ষার বিষয়ে সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে। অনেক নারী এখন নতুন করে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হচ্ছেন। ফুলঝড়ি বেগমের মতো গল্পগুলো সেই আগ্রহকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মা-ছেলের এই গল্প ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই বলছেন, এটি কেবল একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ঘটনা নয়; বরং স্বপ্ন, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের এক জীবন্ত উদাহরণ। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, শিক্ষার প্রতি এমন আগ্রহই একটি সমাজকে এগিয়ে নেয়।

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে এখনো অনেক নারী নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে পরিবার সামলান, সেখানে ফুলঝড়ি বেগম যেন নতুন এক বার্তা দিলেন— ইচ্ছাশক্তি থাকলে জীবনের যে কোনো সময় থেকেই নতুন শুরু করা সম্ভব। তার গল্প হয়তো আরও অনেক নারীকে নতুন করে বই হাতে তুলে নিতে সাহস জোগাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত