কুরবানির হাট মাতাতে প্রস্তুত ২২ মণের কালাচান ও ১৮ মণের সাদাচান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৯ বার

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে দেশের বিভিন্ন এলাকার পশুর খামার। কোথাও বিশাল আকৃতির ষাঁড়, কোথাও আবার ব্যতিক্রমী পরিচর্যায় বড় হওয়া গরু নিয়ে চলছে আলোচনা। তবে ভোলার সদর উপজেলার একটি ছোট্ট গ্রামে এখন সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করেছে দুটি গরু— ‘কালাচান’ ও ‘সাদাচান’। নামের মতোই আলাদা তাদের পরিচিতি। বিশাল আকৃতির এই দুটি গরুকে ঘিরে স্থানীয়দের আগ্রহ যেন দিন দিন আরও বাড়ছে। কারণ শুধু ওজনেই নয়, খাবারের তালিকাতেও রয়েছে ব্যতিক্রমী আয়োজন। নিয়মিত দানাদার খাবারের পাশাপাশি আপেল ও কমলাও খাওয়ানো হয় গরু দুটিকে।

ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চরমনোষা গ্রামের বেপারি বাড়ির খামারি দুলাল বেপারির খামারে এখন প্রতিদিনই ভিড় করছেন আশপাশের মানুষ। কেউ দেখতে আসছেন বিশালদেহী গরু দুটিকে, কেউ আবার খামার পরিচালনার কৌশল জানতে। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের কাছেও কালাচান ও সাদাচান যেন আলাদা এক আকর্ষণের নাম হয়ে উঠেছে।

খামার ঘুরে দেখা যায়, যত্ন আর পরিচর্যার কোনো কমতি নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গরুগুলোর দেখভালে ব্যস্ত সময় পার করেন দুলাল বেপারি, তার স্ত্রী ও ছেলে। বিশাল আকৃতির কালাচানের ওজন প্রায় ২২ মণ, আর সাদাচানের ওজন প্রায় ১৮ মণ। হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান জাতের এই দুটি গরুকে আগামী কুরবানির হাটে তোলার প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে।

খামারি দুলাল বেপারি জানান, দীর্ঘ তিন বছর ধরে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তিনি গরু দুটি লালন-পালন করছেন। তাদের প্রতিদিনের খাবারের তালিকাও বেশ সমৃদ্ধ। সকাল ও বিকালে দুই বেলা মিলিয়ে প্রতিটি গরুকে খাওয়ানো হয় প্রায় ১৮ কেজি দানাদার খাবার। এর মধ্যে থাকে মিষ্টি কুমড়া, আলু, গরুর ফিড, ভুট্টার ভুসি ও গমের ভুসি। এছাড়া দুপুরে খামারে উৎপাদিত জার্মান ঘাসও খাওয়ানো হয়। তবে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো, প্রতি শুক্রবার গরু দুটিকে আপেল কিংবা কমলা খাওয়ানো হয়।

দুলাল বেপারি হাসিমুখে বলেন, “কালাচান আর সাদাচান শুধু গরু না, ওরা আমার পরিবারের সদস্যের মতো। ছোট বাচ্চার মতো আদর-যত্নে বড় করেছি। ভালো খাবার দিলে গরুর স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়, তাই চেষ্টা করি পুষ্টিকর খাবার দিতে।”

তিনি আরও জানান, স্থানীয় একটি খামার থেকে তিনি হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান জাতের দুটি গাভী কিনেছিলেন। পরে সেই গাভী থেকেই জন্ম নেয় কালাচান ও সাদাচান। জন্মের পর থেকেই নিজের খামারে দেশীয় পদ্ধতিতে তাদের লালন-পালন শুরু করেন। বর্তমানে তিন বছর বয়সী এই গরু দুটি এখন এলাকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

খামারির দাবি, কালাচানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ টাকা এবং সাদাচানের দাম ৭ লাখ টাকা। এই দামের কমে বিক্রি করলে লোকসান হবে বলেও জানান তিনি। কারণ গত দেড় বছরে গোখাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ভুসি ও ফিডের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় খরচও অনেক বেড়েছে।

দুলাল বেপারি বলেন, “আগে যে দামে গোখাদ্য পাওয়া যেত, এখন সেই একই খাবারের জন্য অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। তবুও গরুর যত্নে কোনো ঘাটতি রাখিনি। কারণ ভালোভাবে পালন করলে ভালো দাম পাওয়া সম্ভব।”

গ্রামের মানুষও গরু দুটি নিয়ে বেশ গর্ববোধ করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল আজিজুল বলেন, তাদের এলাকায় এত বড় গরু আগে খুব কমই দেখা গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ শুধু কালাচান আর সাদাচান দেখতে আসছেন। অনেকে ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। শিশুদের মধ্যেও এই গরু দুটি নিয়ে আলাদা উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সালাম বেপারি জানান, দুলাল বেপারির খামার দেখে তারও খামার করার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, সঠিক পরিচর্যা ও পরিকল্পনা থাকলে পশুপালন এখন লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হতে পারে।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারাও খামারটির প্রশংসা করেছেন। ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুলাল বেপারি প্রাকৃতিক উপায়ে এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ মেনে গরুগুলো লালন-পালন করেছেন। কোনো ধরনের ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার না করে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে গরু বড় করা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন কুরবানির হাটে খামারি কাঙ্ক্ষিত দাম পাবেন।

বাংলাদেশে কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশুপালন এখন গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষুদ্র খামারি সারা বছর গরু লালন-পালন করে ঈদের সময় বিক্রির মাধ্যমে পরিবারের আর্থিক চাহিদা পূরণ করেন। বিশেষ করে বড় আকৃতির গরুর প্রতি ক্রেতাদের আলাদা আগ্রহ থাকায় খামারিরাও এখন উন্নত জাতের গরু পালনে ঝুঁকছেন।

তবে খামারিরা বলছেন, গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, ওষুধের খরচ এবং শ্রমিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন গরু পালন আগের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তারপরও লাভের আশায় এবং পশুপালনের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা এই পেশায় টিকে আছেন।

এদিকে ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে পশুর হাট জমতে শুরু করেছে। বড় গরু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৈরি হচ্ছে আলাদা আলোচনা। সেই তালিকায় এখন ভোলার কালাচান ও সাদাচানের নামও যুক্ত হয়েছে। বিশাল আকৃতি, বিশেষ খাবার এবং যত্নশীল পরিচর্যার কারণে গরু দুটি ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে বেশ পরিচিতি পেয়েছে।

খামারি দুলাল বেপারি এখন অপেক্ষা করছেন কুরবানির হাটের জন্য। তার আশা, ভালোবাসা আর পরিশ্রমের প্রতিদান হিসেবে কাঙ্ক্ষিত দামেই বিক্রি হবে কালাচান ও সাদাচান। আর সেই সঙ্গে তার খামারের সুনামও ছড়িয়ে পড়বে আরও দূরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত