১১০ সিসি মোটরসাইকেলে লাগবে না অগ্রিম আয়কর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৮ বার
১১০ সিসি মোটরসাইকেলে লাগবে না অগ্রিম আয়কর

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। নগরজীবনের যানজট, দ্রুত যাতায়াতের প্রয়োজন এবং তুলনামূলক কম খরচে চলাচলের সুবিধার কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের বড় একটি অংশ এখন মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় মোটরসাইকেলের ওপর নতুন করে অগ্রিম আয়কর বা এআইটি আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিসিভিত্তিক মোটরসাইকেলের ওপর দুই হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রিম আয়কর দিতে হবে না।

রাজস্ব খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই খাতকে রাজস্ব ব্যবস্থার আওতায় আরও কার্যকরভাবে আনার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। বর্তমানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ ৭০ হাজারের বেশি। প্রতি বছর নতুন করে কয়েক লাখ মোটরসাইকেল সড়কে যুক্ত হচ্ছে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হবে না। অর্থাৎ যারা স্বল্প ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, তাদের ওপর নতুন কোনো করের চাপ পড়বে না। তবে ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের জন্য বছরে দুই হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হতে পারে। ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এই করের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। আর ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের জন্য বছরে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, এই উদ্যোগ সরকারের রাজস্ব আহরণে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে বড় ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল এখন অনেক ক্ষেত্রেই বিলাসবহুল বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে এসব যানবাহনের ওপর কর আরোপকে অযৌক্তিক বলা যাবে না। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন, সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত কম সিসির মোটরসাইকেলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা উচিত হবে না।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, সড়ক আইনে মোটরসাইকেল একটি বৈধ যানবাহন। তাই ব্যক্তিগত গাড়ির মতো মোটরসাইকেলের ওপরও অগ্রিম আয়কর আরোপ করা যৌক্তিক হতে পারে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল এখন বাণিজ্যিকভাবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং, কুরিয়ার ও ডেলিভারি সেবায় মোটরসাইকেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এতে আয় সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে করজাল সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এই খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন তাদের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।

বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকদের এককালীন নিবন্ধন ফি এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর রোড ট্যাক্স দিতে হয়। ৫০ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি প্রায় ৯ হাজার ২৯১ টাকা। এরপর দুই বছর পরপর কিস্তিতে রোড ট্যাক্স দিতে হয়। অন্যদিকে ১২৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি আরও বেশি। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে অগ্রিম আয়কর আরোপ হলে অনেক ব্যবহারকারীর ব্যয় বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি অংশ অবশ্য এই প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে মোটরসাইকেল ব্যবহার আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তার ওপর নতুন কর আরোপ হলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা আরও চাপে পড়বেন। বিশেষ করে যারা কর্মজীবনের প্রয়োজনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, তাদের জন্য এটি বাড়তি বোঝা হতে পারে।

তবে কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্রিম আয়কর মানেই অতিরিক্ত চূড়ান্ত কর নয়। বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, মোটরসাইকেল মালিকরা এই অগ্রিম কর পরবর্তীতে আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবেন। অর্থাৎ যাদের করযোগ্য আয় রয়েছে, তারা চূড়ান্ত কর নির্ধারণের সময় এই অর্থ সমন্বয়ের সুযোগ পাবেন। ফলে এটি এক ধরনের আগাম কর হিসেবে বিবেচিত হবে।

এদিকে বাজেট ঘিরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে— মোটরসাইকেলের ওপর নতুন কর আরোপ দেশের পরিবহন খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে মনে করছেন, কম সিসির মোটরসাইকেলকে করমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত সরকারের একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ দেশের অধিকাংশ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীই ১০০ থেকে ১১০ সিসির বাইক ব্যবহার করেন, যা সাধারণত মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে হলে শুধু নতুন কর আরোপ করলেই হবে না, বরং করদাতাদের জন্য সহজ ও ডিজিটাল প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল নিবন্ধন, রোড ট্যাক্স এবং অগ্রিম আয়কর পরিশোধ প্রক্রিয়া আরও আধুনিক করা প্রয়োজন। এতে রাজস্ব আদায় যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষও ভোগান্তি ছাড়াই কর পরিশোধ করতে পারবেন।

দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এখন রাজস্ব আয় বাড়ানো সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন ব্যয়, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ জোগাতে নতুন নতুন খাতকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। মোটরসাইকেল খাতে অগ্রিম আয়কর আরোপের এই পরিকল্পনাও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত এই কর কাঠামো বাজেটে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং জনগণের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ দেশের লাখ লাখ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর জীবনে এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত