শাফিন আহমেদকে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের অবিস্মরণীয় নক্ষত্রকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৭ বার

প্রকাশ: ২৫শে জুলাই, ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে যাঁরা কেবল শিল্পী নন, বরং একটি প্রজন্মের চেতনাকে ধারণ করতেন। তাঁদের গানের মধ্যে দিয়ে আবেগ, প্রতিবাদ, প্রেম, জীবনবোধ—সব কিছুই প্রবাহিত হয়েছে শক্তিশালী ভাষায়। এই তালিকায় সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি হলো শাফিন আহমেদ। আজ, ২৫শে জুলাই ২০২৫, তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছর এই দিনে, বাংলাদেশ সময় ভোররাতে, যুক্তরাষ্ট্রে চিরবিদায় নেন বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের এক নক্ষত্র।

তাঁর প্রয়াণের এক বছর পরেও বাংলা গানপ্রেমী মানুষ যেন ভুলে যেতে পারেননি সেই কণ্ঠ, সেই স্টেজ পারফরম্যান্স, সেই রোমাঞ্চিত করা সুর ও স্বরের ঢেউ। শাফিন আহমেদ কেবল একজন গায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আন্দোলনের প্রতীক, একটি ধারার অগ্রপথিক। আজ সারাদেশে, বিশেষ করে সঙ্গীত অঙ্গনের মানুষ ও ভক্তদের হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আবার উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শাফিন আহমেদ ছিলেন বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের অন্যতম চালিকাশক্তি। তার কণ্ঠে ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘নীলা’, ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘প্রেমে পড়া বারণ’, ‘ধীরে ধীরে’, ‘হারান মাঝি’—এসব গানগুলো এক একটি ইতিহাসমাইলস ব্যান্ডের প্রধান ভোকালিস্ট হিসেবে তিনি শুধু গানই গেয়ে যাননি, বরং নতুন ধারার সংগীত গড়ে তোলার নেতৃত্বও দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল ব্যতিক্রমী শক্তি, গায়কীতে ছিল অনন্য স্বাতন্ত্র্য। মঞ্চে তিনি ছিলেন বিদ্যুৎচঞ্চল, দর্শককে মুহূর্তেই আবিষ্ট করে ফেলার শক্তি ছিল তাঁর মধ্যে।

তাঁর সুরে, গানে ও গায়কীতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুগ্ধ হয়েছে, এখনও হচ্ছে। তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিটি সুর যেন আজও মানুষের হৃদয়ে অনুরণন তোলে। গানের জগতে শাফিন আহমেদের অবদান কেবল একটি ব্যান্ড বা একটি সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তিনি বাংলা আধুনিক সঙ্গীতের পথ নির্মাতা হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সংগীতশিল্পী হিসেবে তিনি বেড়ে ওঠেন এক অনন্য ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। তাঁর বাবা কমল দাশগুপ্ত ছিলেন বিখ্যাত সুরকার ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতজ্ঞ, মা ফিরোজা বেগম ছিলেন কিংবদন্তি নজরুলসঙ্গীত শিল্পী। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শাফিন আহমেদ তৈরি করেছেন এক নতুন অধ্যায়—একটা আধুনিক, রকধর্মী, সুরের দিগন্ত।

যুক্তরাজ্যে পড়ালেখার সময় পাশ্চাত্য ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রভাবে মুগ্ধ হয়ে তিনি ফিরে আসেন বাংলাদেশে। এরপর ভাই হামিন আহমেদের সঙ্গে গড়ে তোলেন মাইলস ব্যান্ডের নতুন পরিসর। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাইলস হয়ে ওঠে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের অন্যতম অগ্রণী ব্যান্ড।

৮০ ও ৯০-এর দশকে যখন দেশজুড়ে ব্যান্ড সঙ্গীতের বিপ্লব শুরু হয়, তখন মাইলস ছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। আর তার হৃদয়ে ছিলেন শাফিন আহমেদ। তাঁর সৃষ্টি করা ‘প্রত্যাশা’, ‘প্রতীক্ষা’, ‘প্রতিশ্রুতি’—এই অ্যালবামগুলো এখনো শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে। এগুলো কেবল গান নয়, বরং একেকটি সময়ের সাক্ষ্য।

শাফিন আহমেদ ছিলেন একাধারে গায়ক, সুরকার, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক। বাংলা গানে রক ও পপের সংমিশ্রণ করে যে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তাতে তাঁর ছিল সরাসরি ও গভীর অবদান। তাঁর সংগীতায়োজনে যেমন ছিল প্রযুক্তির ব্যবহার, তেমনই ছিল আত্মার গভীর স্পর্শ।

আজ তাঁর অনুপস্থিতি যেন ব্যান্ড জগতের একটি অস্খলিত স্তম্ভ ভেঙে যাওয়ার মতো। তবে তার স্মৃতি, তার সৃষ্টিকর্ম, তার গানের রেখাপথ আজও তরুণদের অনুপ্রাণিত করে। অনেক শিল্পী ও শ্রোতা মনে করেন, শাফিন আহমেদের মতো একজন শিল্পী হারানো শুধু একটি ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ক্ষয়।

তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভক্ত-অনুরাগীরা আয়োজন করেছেন বিশেষ স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল ও গানের সন্ধ্যা। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য আবেগঘন বার্তা, যেগুলোয় উঠে এসেছে তাঁর সংগীত জীবনের প্রভাব ও অবদান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর গান, ছবি ও স্মৃতিচারণার ঢল যেন প্রমাণ করে দেয়—এই শিল্পী এখনও মানুষের হৃদয়ে জীবিত।

শাফিন আহমেদ নেই, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ রয়ে গেছে। রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টি, রয়ে গেছে এক অসামান্য সংগীত ঐতিহ্য, যা যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে, উৎসাহ দেবে এবং তার অনুপস্থিতিকে পূরণ না করতে পারলেও অন্তত মনে করিয়ে দেবে—বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতে একসময় একজন শাফিন আহমেদ ছিলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত