তরুণদের টার্গেট করে ছড়াচ্ছে সিনথেটিক মাদক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ১৩ বার
তরুণদের টার্গেট করে ছড়াচ্ছে সিনথেটিক মাদক

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে মাদকের চিত্র দীর্ঘদিন ধরেই মূলত ইয়াবা, ফেনসিডিল কিংবা হেরোইনকেন্দ্রিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল। সীমান্তঘেঁষা জেলা, উপকূলীয় এলাকা কিংবা শহরের অলিগলিতে এসব মাদকের বিস্তার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু এর আড়ালেই গত কয়েক বছরে দেশে নীরবে গড়ে উঠেছে এক নতুন মাদকের জগৎ, যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও জটিল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং শনাক্ত করা কঠিন। অভিজাত পার্টি, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসকে ঘিরে বিস্তার লাভ করছে এলএসডি, এমডিএমএ, কেটামিন, ফেন্টানাইল, ম্যাজিক মাশরুম ও আইসের মতো সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক।

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বসুন্ধরায় কর্মরত ২৭ বছর বয়সী এক তরুণ, যিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, জানান—তিনি কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পার্টি ও সংগীতানুষ্ঠানে এমডিএমএ গ্রহণ করেছেন। তার ভাষায়, এই মাদক এমনভাবে হাতবদল হয় যেন এটি কোনো সাধারণ সিগারেট। কেউ প্রকাশ্যে কেনাবেচা করে না, আবার ব্যবহারকারীদের অনেকেই এমন সামাজিক অবস্থানে থাকেন, যাদের বিরুদ্ধে সহজে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

র‍্যাবের সাবেক কর্মকর্তা এ এন এম শাকিল নেওয়াজ, যিনি বাংলাদেশে প্রথম দিককার বেশ কয়েকটি ‘হাই-এন্ড’ মাদক উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বলছেন—দেশে নতুন প্রজন্মের মাদক বহু আগেই প্রবেশ করেছে। কেবল সরকারি নথিতে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ধরা পড়তে সময় লেগেছে। তার মতে, মাদকচক্র প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং গোপন সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন এক বাজার তৈরি করেছে, যা প্রচলিত মাদকবিরোধী কাঠামোর বাইরে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অন্তত ১২ ধরনের নতুন মাদক শনাক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে আইস, এলএসডি ও ডিএমটির সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সাইলোসাইবিন ট্যাবলেট, এমডিএমএ ও কেটামিনের মতো মাদকও উদ্ধার হতে থাকে। এসব মাদকের বড় অংশ আন্তর্জাতিক ডাক ও কুরিয়ার সার্ভিস, মিয়ানমার সীমান্ত কিংবা বৈধ ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার ফাঁক ব্যবহার করে দেশে প্রবেশ করছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিনথেটিক মাদকের বাজার প্রচলিত মাদকের চেয়ে আলাদা। ইয়াবা যেখানে বড় আকারের নেটওয়ার্ক ও সীমান্তপথের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এলএসডি বা এমডিএমএর মতো মাদক ক্ষুদ্র কিন্তু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে ছড়ায়। এসব মাদকের ক্রেতা সাধারণত শহুরে উচ্চবিত্ত তরুণ, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সরবরাহকারীদের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

বাংলাদেশে এলএসডি নিয়ে আলোচনার বড় মোড় আসে ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায়। তদন্তে জানা যায়, বন্ধুদের দেওয়া এলএসডি গ্রহণের পর তিনি ভয়ংকর মানসিক বিভ্রমের শিকার হন। পরে রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ফেসবুকভিত্তিক কয়েকটি গোপন গ্রুপের মাধ্যমে এলএসডি সরবরাহের তথ্য বেরিয়ে আসে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, নেদারল্যান্ডস থেকে ডাকযোগে এলএসডির ব্লটার দেশে আনা হতো এবং পরে তা কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হতো।

নিউরোসায়েন্স গবেষণায় দেখা গেছে, এলএসডি মানুষের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন রিসেপ্টরের কার্যক্রম পরিবর্তন করে। এর ফলে বাস্তবতা সম্পর্কে অনুভূতি বিকৃত হয় এবং ব্যবহারকারী ভ্রম বা ‘হ্যালুসিনেশন’-এর শিকার হন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবেশ ও মানসিক অবস্থা খারাপ হলে এটি ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

অন্যদিকে, কেটামিন এখন নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। চলতি বছর রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তিন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ রয়েছে, তারা তরল কেটামিনকে পাউডারে রূপান্তর করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন এবং ব্লুটুথ স্পিকারের ভেতরে মাদক লুকিয়ে বিদেশে পাঠানোর মতো কৌশলও ব্যবহার করা হচ্ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কেটামিনকে চিকিৎসাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও অপব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারকারীকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কেটামিন পাচার গত কয়েক বছরে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে এবং বাংলাদেশও সেই নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে ফেন্টানাইল। যুক্তরাষ্ট্রে এই মাদক হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এটি মরফিনের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী এবং অন্যান্য মাদকের সঙ্গে মিশিয়ে সরবরাহ করা হয় বলে ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না। বাংলাদেশে এখনো ফেন্টানাইল-সম্পর্কিত বড় কোনো মৃত্যুর তথ্য না মিললেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—ফরেনসিক সক্ষমতা সীমিত থাকায় অনেক ঘটনা শনাক্তই হচ্ছে না।

ম্যাজিক মাশরুম বা সাইলোসাইবিন নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গোপনে এসব মাদক চকলেট বা ভিন্ন খাদ্যপণ্যের আড়ালে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি অভিযানে মাশরুম উৎপাদনের ছোট আকারের ল্যাব ও গ্রীনহাউসের সন্ধানও মিলেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি এখন দুই ভিন্ন বাস্তবতায় বিভক্ত। একদিকে আছে সীমান্তপথে আসা প্রচলিত মাদক, অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর ছোট কিন্তু প্রভাবশালী ‘হাই-এন্ড’ বাজার। দ্বিতীয় বাজারটি সহজে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু এর বিস্তার দ্রুত এবং নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কঠিন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে উন্নত ফরেনসিক ল্যাব, সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং অর্থপাচার তদন্ত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আধুনিক স্ক্যানার বসানোর কাজও চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, এসব অবকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হতে আরও সময় লাগবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই কৃত্রিম মাদক নিয়ন্ত্রণ। কারণ এগুলো স্বল্প পরিমাণে বহন করা যায়, দ্রুত নতুন রূপে বাজারে আসে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণদের কাছে খুব সহজে পৌঁছে যায়। প্রচলিত মাদকবিরোধী অভিযান দিয়ে এই নতুন বাস্তবতা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, দ্রুত ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কার্যকর উদ্যোগ।

বাংলাদেশের শহুরে জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাদকের ধরনও বদলে যাচ্ছে। অভিজাত পার্টি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপ থেকে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে নতুন এক অদৃশ্য সংকট তৈরি হয়েছে। আর সেই সংকটের ভয়াবহতা হয়তো পুরোপুরি দৃশ্যমান হওয়ার আগেই দেশের মাদকবিরোধী ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত