প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের জনপ্রিয় কৌতুকশিল্পী, অভিনেত্রী ও উপস্থাপক ভারতি সিং বহু বছর ধরেই টেলিভিশন দর্শকদের হাসির খোরাক জুগিয়ে আসছেন। প্রাণবন্ত উপস্থাপনা, অসাধারণ কমেডি টাইমিং এবং মঞ্চে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির কারণে তিনি ভারতীয় বিনোদন অঙ্গনে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। তবে ক্যামেরার সামনে যিনি সবসময় হাসিখুশি, আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণোচ্ছল, তার ব্যক্তিগত জীবনের গল্পটা ছিল অনেক বেশি কঠিন, বেদনাময় এবং সংগ্রামের।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, শারীরিক গঠন নিয়ে সামাজিক কটাক্ষ এবং মানসিক চাপের কথা খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন ভারতি সিং। তিনি জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই শরীরের ওজন নিয়ে মানুষ তাকে নানা ধরনের মন্তব্য করত। শুধু বাইরের মানুষই নয়, এমনকি নিজের পরিবারের কাছ থেকেও তাকে শুনতে হয়েছে কষ্টদায়ক কথা। তার ভাষায়, তখনকার সময়ে কাউকে ‘মোটা’ বা ‘কালো’ বলে ডাকা যেন খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় ছিল। কেউ ভাবত না, এসব মন্তব্য একটি শিশুর মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতি সিং বলেন, তার মা প্রায়ই মজা করে বলতেন— “আর কত খাবি? এবার খাওয়া বন্ধ কর, না হলে আরও মোটা হয়ে যাবি।” ছোটবেলায় এসব কথা শুনতে শুনতে তিনি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বড় হওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেন, এমন মন্তব্য একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশেষ করে যখন কাছের মানুষরাই সেই কথাগুলো বলেন, তখন কষ্টটা আরও গভীর হয়।
ভারতি জানান, তার শৈশব খুব একটা সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ছিল সীমিত। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। একসময় কমেডিকে তিনি নিজের শক্তি হিসেবে গড়ে তোলেন। মানুষ তাকে নিয়ে হাসলেও, তিনি সেই হাসিকেই নিজের অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। তবে বাস্তবতা হলো, বিনোদন অঙ্গনে প্রবেশের পরও তাকে শারীরিক গঠন নিয়ে কটাক্ষ শুনতে হয়েছে নিয়মিত।
ভারতের টেলিভিশন জগতে দীর্ঘদিন ধরেই স্থূলতাকে কেন্দ্র করে কৌতুক তৈরি করার প্রবণতা ছিল। অনেক সময় কোনো চরিত্রকে হাস্যরসের উপাদান বানাতে তার শরীর, উচ্চতা বা গায়ের রঙ নিয়ে ব্যঙ্গ করা হতো। ভারতি সিং বলেন, তিনি নিজেও এই সংস্কৃতির শিকার হয়েছেন। তবে সেই অভিজ্ঞতাই তাকে ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ক্যারিয়ারের শুরুতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অন্য কাউকে অপমান করে বা কারও শারীরিক গঠন নিয়ে হাসাহাসি করে তিনি কখনো কমেডি করবেন না। কারণ তিনি জানেন, এই ধরনের কথাগুলো একজন মানুষের আত্মসম্মানে কতটা আঘাত করতে পারে। তার মতে, হাস্যরস কখনোই কাউকে ছোট করার মাধ্যম হতে পারে না।
বর্তমানে ভারতি সিং শুধু একজন কৌতুকশিল্পী নন, বরং তিনি অসংখ্য মানুষের কাছে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। নিজের ওজন, চেহারা বা সামাজিক সমালোচনাকে উপেক্ষা করে তিনি যেভাবে বিনোদন অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তা অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।
ভারতি সিংয়ের ব্যক্তিগত জীবনও ভক্তদের কাছে বেশ আলোচিত। স্বামী হর্ষ লিম্বাচিয়া-র সঙ্গে একাধিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে তিনি আরও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, মজার কথোপকথন এবং সহজ-সরল সম্পর্ক দর্শকদের মন জয় করেছে। তবে ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্পগুলো খুব কম সময়ই সামনে এনেছেন ভারতি।
এই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, সমাজে এখনো বডি শেমিং একটি বড় সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এটি আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। মানুষ খুব সহজেই অন্যের ছবি বা ভিডিও দেখে নেতিবাচক মন্তব্য করে বসে। অথচ তারা বুঝতে চায় না, এসব মন্তব্য একজন মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ছোটবেলা থেকে শারীরিক গঠন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে শুনতে অনেক শিশু আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অনেকেই নিজের চেহারা নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। কেউ কেউ সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। বিশেষ করে পরিবার থেকে সমর্থনের বদলে কটাক্ষ পেলে সেই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে থেকে যেতে পারে।
ভারতি সিংয়ের বক্তব্য নতুন করে সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ সমাজে এখনো অনেক মানুষ আছেন, যারা না বুঝেই অন্যের শরীর নিয়ে মন্তব্য করেন। কিন্তু একজন জনপ্রিয় তারকার খোলামেলা স্বীকারোক্তি হয়তো অনেককেই ভাবতে বাধ্য করবে— কথার আঘাত কখনো কখনো দৃশ্যমান ক্ষতের চেয়েও গভীর হতে পারে।
বর্তমানে ভারতি সিং ভারতীয় টেলিভিশনের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ। নানা ধরনের রিয়েলিটি শো, কমেডি অনুষ্ঠান ও উপস্থাপনায় তিনি ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে জনপ্রিয়তার এই শীর্ষে পৌঁছাতে তাকে যে কতটা মানসিক লড়াই করতে হয়েছে, তার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার যেন সেই অজানা গল্পেরই একটি দরজা খুলে দিল।