দুই মাসেই আসছে প্রবাসী কার্ড, মিলবে নতুন সুবিধা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
  • ৪৮ বার
কারা পাবেন প্রবাসী কার্ড

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, আমেরিকা থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সেই প্রবাসীদের জন্য এবার নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের পর এবার চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যেই এই কার্ড হাতে পেতে শুরু করবেন প্রবাসীরা।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ বাড়ানো এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের একটি সমন্বিত সেবা ব্যবস্থার আওতায় আনতেই এই কার্ড চালু করা হচ্ছে। সরকারের আশা, নতুন এই উদ্যোগ প্রবাসীদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সেবাপ্রাপ্তি সহজ করবে এবং একইসঙ্গে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়াবে।

যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সরকার এমন একটি ডিজিটালভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়, যার মাধ্যমে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা একটি পরিচয়ের আওতায় বিভিন্ন সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেবা, রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এই কার্ড কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং বা বিএমইটির কার্ড চালু রয়েছে। বিদেশে বৈধভাবে কাজ করতে যাওয়া কর্মীদের বিএমইটিতে নিবন্ধনের পর এই কার্ড দেওয়া হয়। এতে কর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য, কর্মস্থল, পাসপোর্ট ও যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য সরকারি ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। ফলে বিদেশে কোনো দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা আইনি জটিলতা তৈরি হলে সরকার দ্রুত সহায়তা দিতে পারে।

তবে দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসীদের অভিযোগ ছিল, বিএমইটি কার্ড বাস্তব জীবনে খুব বেশি কার্যকর নয়। অনেকেই বলছেন, বিমানবন্দর বা সরকারি দপ্তরে এই কার্ড দেখিয়ে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায় না। আবার বিদেশে জরুরি পরিস্থিতিতে অনেক সময় তথ্য থাকলেও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে নতুন প্রবাসী কার্ড নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— এটি কি শুধু নাম বদলের উদ্যোগ, নাকি বাস্তবেই এতে বাড়তি সুবিধা মিলবে?

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, নতুন প্রবাসী কার্ড শুধু পরিচয়পত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে ব্যাংকিং সিস্টেম যুক্ত করা হবে। অর্থাৎ একজন প্রবাসী তার রেমিট্যান্স, সঞ্চয়, আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি সহায়তা একই প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনতে পারবেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো প্রবাসীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, ঋণ সুবিধা কিংবা বিনিয়োগের সুযোগও ভবিষ্যতে এই কার্ডের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম পর্যায়ে বৈধভাবে বিদেশে কর্মরত এবং বিএমইটিতে নিবন্ধিত প্রবাসীরাই এই কার্ড পাবেন। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠান, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে অন্যান্য প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু কার্ড চালু করলেই হবে না, সেটিকে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর করতে হবে। তাদের মতে, বিদেশে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি ভাষাগত সমস্যা, আইনি জটিলতা, বেতন বকেয়া কিংবা প্রতারণার শিকার হন। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন কার্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাবে। তারা বলছেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, দূতাবাস এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন নাগরিকদের জন্য স্মার্ট কার্ড বা ডিজিটাল পরিচয়ভিত্তিক সেবা চালু হয়েছে। বাংলাদেশও যদি সেই পথে এগোয়, তাহলে প্রবাসীরা অনেক সুবিধা পেতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বিমানবন্দরে দ্রুত সেবা, দূতাবাসে অগ্রাধিকার, সহজ ব্যাংক হিসাব, স্বল্পসুদে ঋণ কিংবা দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এতে প্রবাসীরা দেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকবেন।

প্রবাসীদের অনেকেই নতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত কয়েকজন বাংলাদেশি সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, যদি এই কার্ড সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয়, তাহলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের অনেক ভোগান্তি কমবে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা, আইনি সহায়তা বা দেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে দ্রুত সেবা পাওয়া গেলে সেটি হবে বড় স্বস্তির বিষয়।

তবে কেউ কেউ আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অতীতে অনেক উদ্যোগ শুরু হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন দুর্বল ছিল। ফলে নতুন কার্ডের ক্ষেত্রেও যেন একই পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে তথ্য নিরাপত্তা, অনলাইন জটিলতা এবং দালালচক্রের অপতৎপরতা ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ আসে প্রবাসী আয় থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে নগদ প্রণোদনাও দিচ্ছে। নতুন প্রবাসী কার্ড সেই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, প্রবাসীদের জন্য একটি সমন্বিত পরিচয় ও সেবা কাঠামো তৈরি করা গেলে দেশের অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নন, তারা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। তাই তাদের জন্য নেওয়া যেকোনো উদ্যোগ বাস্তবমুখী, স্বচ্ছ এবং সহজসাধ্য হওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রবাসী কার্ড যদি সত্যিই প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে এটি সরকারের অন্যতম সফল উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com