তেলের দাম কমতেই ঘুরে দাঁড়াল ইউরোপের বাজার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ১৭ বার
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা অচলাবস্থার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াল ইউরোপের শেয়ারবাজার

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অচলাবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও ইউরোপের শেয়ারবাজারে দেখা গেছে স্বস্তির আভাস। টানা চাপের পর মঙ্গলবার ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ফিরে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সাময়িক আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমে আসায় বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বাজারে আস্থা খুঁজে পেয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা বিশ্ববাজারে গভীর প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা এবং শান্তি আলোচনায় অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছিল। এর প্রভাব পড়ে ইউরোপসহ বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে। তবে মঙ্গলবার বাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।

গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৭টা ৩ মিনিটে প্যান-ইউরোপিয়ান স্টক্স ৬০০ সূচক ০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৬১১ দশমিক ০৬ পয়েন্টে পৌঁছায়। আগের দিন একই সূচক প্রায় ১ শতাংশ কমে বন্ধ হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র একদিনের ব্যবধানে বাজারে বড় ধরনের মানসিক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম কমে আসার খবর বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন।

ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর শেয়ারবাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। জার্মানির ডিএএক্স সূচক ০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। স্পেনের আইবেক্স-৩৫ সূচক বেড়েছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ। ফ্রান্স ও ইতালির বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে জ্বালানি ও শিল্প খাতের শেয়ারগুলোতে লেনদেন বাড়তে শুরু করেছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম সামান্য কমলেও অনিশ্চয়তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় যেকোনো সময় নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সচদেবা বলেন, তেলের সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এখনো বাজারকে প্রভাবিত করছে। তবে তেলের দাম কিছুটা কমে আসায় বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তার মতে, বিনিয়োগকারীরা এখনও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা পাচ্ছেন না। ফলে বাজারে সতর্ক লেনদেন অব্যাহত রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক সময় পার করছে, যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি আর্থিক বাজারকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিগুলো আন্তর্জাতিক তেলের দামের ওঠানামায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতা সেই প্রচেষ্টাকে আবারও চাপের মুখে ফেলছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউরোপের শিল্প খাত এবং পরিবহনব্যবস্থা তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতে তেলের দাম কমলে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী হয়ে ওঠেন। মঙ্গলবারের বাজার পরিস্থিতিও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে ওই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত বা অবরোধ সৃষ্টি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির বড় সংকট তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শুধু তেলের বাজারেই নয়, বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

এদিকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে চলমান হিসাব-নিকাশের মধ্যেই নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি যুক্ত হওয়ায় নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বিশ্ববাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। যদি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায় অথবা জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে বিশ্ববাজারে আবারও অস্থিরতা ফিরে আসতে পারে। অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি হলে শেয়ারবাজারে আরও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যেতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাজারে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও বিনিয়োগকারীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাজনৈতিক সংঘাত, সামরিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই বাজারের প্রতিটি সূচক এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক পরিস্থিতির দিকেও নজর রেখে এগোচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত