দেশের বিশাল বাজেট ঘাটতিতে চাপে সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘিরে অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন করে উদ্বেগ ও আলোচনার ঝড়। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবার বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশের কাছাকাছি। এই বিশাল ঘাটতির চাপ সামাল দিতে গিয়ে নতুন সরকার বড় ধরনের আর্থিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বড় একটি ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে, যা পূরণে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে আরও ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর অর্থনীতি বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ অর্থনীতিতে আপাতত স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে চাপ তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে তা সরাসরি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দেয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে।

অর্থনীতিবিদদের আরেকটি অংশ মনে করছেন, রাজস্ব আদায়ের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়া এবং ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ার কারণেই বাজেট ঘাটতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে বিকল্প উৎস খুঁজে নিলে বেসরকারি খাত কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। সোনালী ব্যাংক পিএলসি–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও জানিয়েছেন, সরকারের বিভিন্ন বিকল্প অর্থায়ন উৎস রয়েছে, যা ব্যবহার করলে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে না বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণের চেয়ে বেশি অর্থ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথম ১০ মাসেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের বড় অংশের ঋণ যদি অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে বেসরকারি খাত তুলনামূলকভাবে উচ্চ রিটার্ন ও কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ করে থাকে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

এদিকে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ ও অর্থ সরবরাহ বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চলমান পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব আদায় নিয়েও রয়েছে বড় চাপ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ইতোমধ্যে লক্ষ্য অনুযায়ী কর আদায়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কর ফাঁকি, কম কর সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই বাজেটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন বসতে যাচ্ছে, যেখানে বাজেট কাঠামো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আসন্ন বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে এটিকে নতুন রাজনৈতিক সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে নতুন দিকনির্দেশনা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাজেট যত বড় হচ্ছে, ততই এর বাস্তবায়ন ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ রাজস্ব আয় বাড়ানো, ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

তাদের মতে, শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপের মধ্যে এই বাজেটকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে কঠোর নীতি শৃঙ্খলা প্রয়োজন হবে।

সব মিলিয়ে আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের সতর্ক অবস্থান তৈরি হয়েছে। একদিকে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা, অন্যদিকে ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত