প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক জল্পনা, দফায় দফায় বৈঠক এবং কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ আলোচনার পর অবশেষে কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ভিডি সাতিসান–এর নাম। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউডিএফের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর কে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন, তা নিয়ে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সাতিসানের ওপরই আস্থা রাখে এবং তার হাতেই তুলে দেওয়া হয় দক্ষিণ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ এই রাজ্যের নেতৃত্ব।
কেরালার রাজনৈতিক অঙ্গনে এই সিদ্ধান্তকে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, বরং নতুন এক রাজনৈতিক বার্তার সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ গত এক দশক ধরে রাজ্যটি শাসন করেছে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা এলডিএফ। সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে এবার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে ইউডিএফ। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল— জয়ের নায়ক হিসেবে পরিচিত সাতিসান কি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাবেন, নাকি দলের অভিজ্ঞ অন্য কোনো নেতা সামনে আসবেন? শেষ পর্যন্ত সব আলোচনা, মতবিরোধ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পেরিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব তার পক্ষেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন ঘিরে কংগ্রেসের ভেতরে বিভিন্ন পর্যায়ে মতপার্থক্য ছিল। আলোচনায় উঠে আসে কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা ও সাংসদ কেসি ভেনুগোপাল–এর নাম। একইসঙ্গে জ্যেষ্ঠ নেতা রমেশ চেন্নিথালা–কেও সম্ভাব্য মুখ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তরুণ কর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার কারণে শেষ পর্যন্ত সাতিসানই এগিয়ে যান।
নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক মুকুল ওয়াসনিক এবং অজয় মাকেন কেরালার বিধায়ক ও সাংসদদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেন। পরে তাদের মতামত জানানো হয় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী–কে। রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, রাহুল গান্ধী ব্যক্তিগতভাবে সাতিসানের সঙ্গে কথা বলেন এবং কেরালার জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করেন। এরপরই দলের হাইকমান্ড আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়।
এর আগে কংগ্রেস লেজিসলেচার পার্টি বা সিএলপি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাস করে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের সম্পূর্ণ ক্ষমতা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে তুলে দেয়। এতে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েনের অবসান ঘটে এবং দলের ভেতরে বিভক্তির আশঙ্কাও অনেকটা কমে আসে।
৬১ বছর বয়সী ভিডি সাতিসানের রাজনৈতিক জীবন সংগ্রাম, ধারাবাহিকতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ। কেরালার এরনাকুলাম জেলার নেত্তুরে জন্ম নেওয়া সাতিসান ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। থেভারার সেক্রেড হার্ট কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। পরে তিনি মহাত্মা গান্ধী ইউনিভার্সিটি ইউনিয়ন এবং ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনে নেতৃত্ব দেন। ছাত্র রাজনীতি থেকেই তিনি কংগ্রেসের সাংগঠনিক রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। ১৯৯৬ সালে প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে তিনি শেষ বলে মেনে নেননি। বরং আরও সংগঠিতভাবে মাঠে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সাল থেকে টানা পারাভুর আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি কেরালার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। সময়ের সঙ্গে তিনি শুধু জনপ্রতিনিধি নন, বরং কংগ্রেসের অন্যতম কার্যকর কৌশলবিদ হিসেবেও পরিচিতি পান।
সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় সাতিসান ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নকে সামনে আনেন। তিনি সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু— উভয় ধরনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইউডিএফকে বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এই অবস্থান তরুণ ভোটার এবং মধ্যপন্থী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিশেষ করে ‘টিম ইউডিএফ’ স্লোগানটি নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সংগঠিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং একাধিক উপনির্বাচনে ইউডিএফের সাফল্যের পেছনেও সাতিসানের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং কর্মীদের সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তাকে কেন্দ্র করেই কংগ্রেসের বড় অংশ আশাবাদী হয়ে ওঠে।
এবারের নির্বাচনে ইউডিএফ যে ফল করেছে, তা কেরালার রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৪০ আসনের বিধানসভায় ইউডিএফ জিতেছে ১০২টি আসন। এর মধ্যে কংগ্রেস এককভাবে পেয়েছে ৬৩টি আসন। জোটের অন্যতম শরিক ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ পেয়েছে ২২টি আসন। বিপরীতে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়ন–এর নেতৃত্বাধীন এলডিএফ জোট বড় ধরনের ভরাডুবির মুখে পড়ে। পুরো জোটটি মাত্র ৩৫টি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে সিপিআইএম পেয়েছে ২৬টি এবং সিপিআই পেয়েছে ৮টি আসন। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি তিনটি আসনে জয় পেয়ে কেরালায় নিজেদের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান করেছে।
কেরালার রাজনীতিতে এই পরিবর্তন শুধু একটি সরকার বদলের ঘটনা নয়; এটি রাজ্যের ভোটারদের মনোভাবেরও বড় ইঙ্গিত। দীর্ঘদিনের শাসনের পর এলডিএফ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক ক্লান্তির অভিযোগ উঠছিল। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ উন্নয়ন, স্বচ্ছতা এবং নতুন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাতিসানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জোটের ভেতরে ঐক্য ধরে রাখা। কারণ ইউডিএফের ভেতরে একাধিক দল ও স্বার্থ জড়িত রয়েছে। একইসঙ্গে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা— এসব বিষয়েও নতুন সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে কংগ্রেসের অনেক নেতাকর্মী মনে করছেন, সাতিসানের নেতৃত্বে কেরালায় নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হতে পারে। তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের সমন্বয়ে তিনি প্রশাসন পরিচালনা করলে রাজ্যের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং জাতীয় রাজনীতিতেও কংগ্রেস নতুন আত্মবিশ্বাস পাবে।
কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে ভিডি সাতিসানের রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে রাজ্যের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে পৌঁছানো তার এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যবসায়, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সময়োপযোগী নেতৃত্বেরও প্রতীক হয়ে থাকল।