নারায়ণগঞ্জে ক্ষ্যাপাটে মহিষ ‘নেতানিয়াহু’ ভাইরাল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
নারায়ণগঞ্জে ভাইরাল মহিষ নেতানিয়াহু, দেখতে ভিড় মানুষের

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুরবানির ঈদ ঘিরে প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যতিক্রমধর্মী গরু, মহিষ কিংবা ছাগল নিয়ে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়। কোনো পশুর বিশাল আকৃতি, কোনোটির অদ্ভুত রং, আবার কোনোটির আচরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এবার সেই তালিকায় নতুন সংযোজন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার একটি খামারের অ্যালবিনো মহিষ ‘নেতানিয়াহু’। গোলাপি আভাযুক্ত চামড়া, চোখ ও চুলের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য এবং আক্রমণাত্মক স্বভাবের কারণে ইতোমধ্যে এলাকাজুড়ে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে এই মহিষটি।

নারায়ণগঞ্জের দাসেরগাঁও এলাকার এস এস ক্যাটেল ফার্ম–এ প্রস্তুত করা হয়েছে ব্যতিক্রমী এই মহিষটিকে। খামার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কুরবানির ঈদ সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ যত্নে পালন করা হয়েছে এটিকে। প্রায় ৭৬০ কেজির বেশি ওজনের অ্যালবিনো জাতের এই মহিষ দেখতে প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দর্শনার্থীদের ভিড় আরও বেড়ে গেছে।

খামারটিতে ঢুকতেই দূর থেকে চোখে পড়ে গোলাপি আভাযুক্ত বিশালদেহী মহিষটি। সাধারণ মহিষের তুলনায় এর গায়ের রং অনেকটাই আলাদা। সেই সঙ্গে চোখের গঠন ও মাথার চুলের বিন্যাসও অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তবে শুধু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য নয়, এর অদ্ভুত আচরণই মূলত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

খামারের কর্মীরা জানান, মহিষটি অত্যন্ত চঞ্চল ও খিটখিটে স্বভাবের। কেউ কাছে গেলেই শিং নাড়িয়ে তেড়ে আসে। অনেক সময় খাবার দিতে গেলেও গুঁতো দেওয়ার চেষ্টা করে। এ কারণেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু–এর নামের সঙ্গে মিল রেখে এর নাম রাখা হয়েছে ‘নেতানিয়াহু’। খামার কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, মহিষটির আক্রমণাত্মক আচরণ এবং মুখাবয়বের কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নেতানিয়াহুর মিল খুঁজে পেয়েই এমন নামকরণ করা হয়েছে।

দর্শনার্থীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই কৌতূহল নিয়ে মহিষটিকে দেখতে আসছেন, আবার কেউ কেউ ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন। খামারে আসা দর্শনার্থী রফিক মিয়া বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাম শুনে তিনি মহিষটিকে দেখতে এসেছেন। কাছে এসে তার মনে হয়েছে, প্রাণীটির আচরণে সব সময় এক ধরনের যুদ্ধংদেহী ভাব রয়েছে। মানুষের দিকে তাকিয়ে শিং নাড়ানো এবং কাছে আসলে তেড়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণে নামটি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে।

আরেক দর্শনার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, তিনি প্রথমে বিষয়টিকে মজা হিসেবে নিয়েছিলেন। কিন্তু খামারে এসে দেখেন মহিষটি সত্যিই বেশ আক্রমণাত্মক। খামারিরা খাবার দিতে গেলেও সেটি অস্থির হয়ে ওঠে। তিনি জানান, মহিষটির চোখ ও চুলের গঠনের কারণেও অনেকে এর সঙ্গে নেতানিয়াহুর চেহারার মিল খুঁজে পাচ্ছেন।

খামারের কর্মী আল আমিন জানান, ছোটবেলা থেকেই মহিষটির আচরণ অন্য প্রাণীদের তুলনায় আলাদা ছিল। সাধারণত খামারের অন্যান্য পশু সহজে মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নিলেও এই মহিষটি সব সময় একটু দূরত্ব বজায় রাখে। তিনি বলেন, অনেক সময় পরিচর্যা করতে গেলেও সেটি ফোঁসফোঁস শব্দ করে এবং গুঁতো দিতে চায়। তাই কর্মীদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়।

খামারের ব্যবস্থাপক মেহেদি বলেন, প্রাণীটির নামকরণ নিয়ে শুরুতে মজার ছলে আলোচনা হলেও পরে সেটিই জনপ্রিয় হয়ে যায়। তার ভাষায়, চুলের মাঝখানের সিঁথির মতো অংশ, চোখের গঠন এবং সব সময় আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে ‘নেতানিয়াহু’ নামটিই সবচেয়ে বেশি মানানসই মনে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, খামারের রাখাল যারা ছোট থেকে মহিষটিকে বড় করেছে, তাদের দিকেও অনেক সময় তেড়ে আসে প্রাণীটি। ফলে এটিকে সামলাতে আলাদা সতর্কতা নিতে হয়।

খামার কর্তৃপক্ষের দাবি, মহিষটির খাবার ও পরিচর্যায় কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি। প্রতিদিন ঘাস, ভুসি, খৈল ও পুষ্টিকর খাদ্য দেওয়া হয়। পাশাপাশি দিনে দুইবার গোসল করানো হয় এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখা হয়। তবে স্বভাবগত কারণে এটি অন্য পশুর সঙ্গে খুব বেশি মিশে না। অনেক সময় একা থাকতে পছন্দ করে বলেও জানিয়েছেন খামারের কর্মীরা।

কুরবানির পশুর বাজারে ব্যতিক্রমী প্রাণীর প্রতি মানুষের আগ্রহ বরাবরই বেশি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এমন প্রাণী দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে। কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল আকৃতির গরু বা অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের পশুকে কেন্দ্র করে অনলাইনভিত্তিক প্রচারণা বেড়েছে। খামারিরাও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিক্রির অন্যতম বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। ‘নেতানিয়াহু’ নামের এই মহিষটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে উঠেছে।

খামার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহিষটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে লাইভ ওজন অনুযায়ী। প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা হিসেবে মূল্য চাওয়া হচ্ছে। সেই হিসাবে মহিষটির সম্ভাব্য দাম কয়েক লাখ টাকার মধ্যে দাঁড়াবে। খামার ব্যবস্থাপক মেহেদির আশা, ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কারণে দ্রুতই ক্রেতা পাওয়া যাবে।

শুধু এই মহিষ নয়, এস এস ক্যাটেল ফার্ম–এ এবারের কুরবানির ঈদ উপলক্ষে তিন শতাধিক পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন জাতের গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া। খামার কর্তৃপক্ষ বলছে, ইতোমধ্যে অধিকাংশ পশু বিক্রি হয়ে গেছে এবং বাকিগুলোর প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের ঈদে নারায়ণগঞ্জ জেলায় কুরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার। বিপরীতে জেলার ৬ হাজার ৫৩৫টি খামারে প্রস্তুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কুরবানিযোগ্য প্রাণী। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুল মান্নান জানান, স্থানীয় খামারগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পশু পালন নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। একইসঙ্গে কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ বা ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহারের বিষয়েও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কুরবানির পশুকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও আগ্রহ এখন শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্যতিক্রমী পশুকে কেন্দ্র করে মানুষের আগ্রহ নতুন ধরনের বিনোদন ও আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করছে। তবে সেই সঙ্গে প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ এবং দায়িত্বশীল উপস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নারায়ণগঞ্জের ‘নেতানিয়াহু’ এখন শুধু একটি মহিষ নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচিত এক চরিত্রে পরিণত হয়েছে। কেউ একে দেখছেন মজার বিষয় হিসেবে, কেউ দেখছেন ব্যতিক্রমী প্রাণী হিসেবে, আবার কেউ কৌতূহল মেটাতে ছুটে যাচ্ছেন খামারে। ঈদের আগে এই মহিষটি আরও কতটা আলোচনায় আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত