প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রার অংশ হিসেবে ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও স্থানীয় মানুষের দাবির পর অবশেষে উত্তরাঞ্চলের এই জেলায় সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এলো। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এর ফলে দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮টিতে।
বুধবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এ প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সংস্থাকেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
নতুন এই মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা শিক্ষা ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায় পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের মানুষ মনে করছেন, এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং পুরো অঞ্চলের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা।
স্থানীয়দের মতে, এতদিন চিকিৎসা শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের রংপুর, রাজশাহী কিংবা ঢাকাসহ দূরবর্তী শহরে যেতে হতো। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের ব্যয় বাড়ত, অন্যদিকে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ত। নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হলে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন দুয়ার খুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে চিকিৎসক সংকট মোকাবিলা এবং জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য থেকেই সরকার নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি করাই এখন অন্যতম অগ্রাধিকার।
বর্তমানে দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে ৩৮টি। পাশাপাশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৬৬টি। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশে চিকিৎসা শিক্ষার পরিধি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে শিক্ষার মান, অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট এবং হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সুবিধা নিয়ে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; একইসঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ দক্ষ চিকিৎসক তৈরির জন্য প্রয়োজন আধুনিক ল্যাব, পর্যাপ্ত শিক্ষক, উন্নত হাসপাতাল সুবিধা এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ। ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে চিকিৎসা শিক্ষার বর্তমান কাঠামোতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানেও কয়েকটি মেডিকেল কলেজ পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস বা বিইউপির অধীনে বগুড়া, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর ও রংপুরে মেডিকেল কলেজ পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ঢাকায় সশস্ত্র বাহিনী মেডিকেল কলেজ পরিচালিত হচ্ছে সশস্ত্র বাহিনী চিকিৎসা শাখার মাধ্যমে। সম্প্রতি নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামেও নতুন একটি মেডিকেল কলেজ চালু হয়েছে।
চিকিৎসা শিক্ষা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে আসন সংখ্যাতেও পরিবর্তন এসেছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগে সরকারি মেডিকেলে প্রায় ৫ হাজার ৩৮০ জন এবং বেসরকারি মেডিকেলে ৬ হাজার ২৯৩ শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেতেন। তবে গত বছরের আসন পুনর্বিন্যাসের পর সরকারি মেডিকেলে আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১০০ এবং বেসরকারি মেডিকেলে ৬ হাজার ১টি।
অন্যদিকে সেনাবাহিনী পরিচালিত মেডিকেল কলেজগুলোতে মোট ২৫০টি আসন রয়েছে। প্রতিটি কলেজে ৫০টি করে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পান। এছাড়া ঢাকার সশস্ত্র বাহিনী মেডিকেল কলেজ–এ রয়েছে ১২৫টি আসন। নতুন করে চালু হওয়া নৌবাহিনীর মেডিকেল কলেজে আরও ৫০টি আসন যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর মেডিকেল কলেজে মোট আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৫২৬টিতে।
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক না থাকায় সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসক তৈরি হলে ভবিষ্যতে এই সংকট অনেকটাই কমে আসতে পারে।
ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের বিষয়টিকে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলও ইতিবাচকভাবে দেখছে। তাদের মতে, এটি শুধু স্বাস্থ্য শিক্ষার উন্নয়ন নয়, বরং জেলার অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। একটি মেডিকেল কলেজকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল, আবাসন, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ অবশ্য মনে করছেন, দ্রুত অনুমোদন দিলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি। অনেক সময় অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। ফলে অনুমোদনের পরও শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হতে বিলম্ব হয়। ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি মানোন্নয়নের প্রশ্নও এখন আলোচনায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক তৈরি করতে আধুনিক কারিকুলাম, গবেষণা সুবিধা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে জেলা পর্যায়ে উন্নত হাসপাতাল গড়ে তোলার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ পান।
ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সরকার উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে নতুন বার্তা দিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি বাস্তবায়িত হলে শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, আশপাশের জেলাগুলোর মানুষও উন্নত চিকিৎসা ও চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ পাবেন। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই উদ্যোগ এখন কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা।