প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসতে রাজি নয় বলে জানিয়েছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্ধারিত ‘রেড লাইন’ না মানলে ইরানের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা সম্ভব নয়।
এই অবস্থান এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ইরান ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে পরমাণু ইস্যুতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে দুই পক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে এই আলোচনা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য স্পষ্ট—ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। তার মতে, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, আলোচনার অগ্রগতি নির্ভর করবে ইরানের আচরণ ও তাদের নীতিগত পরিবর্তনের ওপর।
অন্যদিকে ইরানও নিজেদের অবস্থান কঠোরভাবে তুলে ধরছে। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ তারা মেনে নেবে না। ইরান এই জলপথকে নিজেদের কৌশলগত ও সার্বভৌম অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে, যা বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামনে বেশ কিছু কঠিন শর্ত তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত সম্পূর্ণ সরিয়ে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করা। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র জব্দ করা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য আরও গভীর হয়েছে।
ইরানের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, আলোচনার শুরুতে কিছুটা নমনীয়তা থাকলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কঠোর হয়ে ওঠে। তেহরানের দাবি, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যায়ে এই সমঝোতা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, ফলে আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের অবস্থানও একই রকম কঠোর। জেডি ভ্যান্সের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই এমন চুক্তি মেনে নেবে না যা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে এগিয়ে নেয়। তার মতে, এটি শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
অন্যদিকে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তাদের অবকাঠামো বা সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার জানিয়েছেন, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এতটাই শক্তিশালী যে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ বলেছেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনার সুযোগ নেই। এই জলপথ ইরানের কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও অবস্থান পরিবর্তন করা হবে না।
এই উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই টানাপোড়েন শুধু কূটনৈতিক সীমায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সরাসরি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হওয়ায় এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যেকোনো উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক পরিস্থিতিও নতুন বিতর্কে জড়িয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক তৈরি হয়। যদিও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তিনি গোপনে আমিরাত সফর করে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, তবে আবুধাবি এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াম জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর কোনো সফর বা ইসরায়েলি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানোর তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এই ঘটনাও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক উত্তেজনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। একদিকে পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় ঘোষণা—এই দুই বিপরীত অবস্থান কোনো সহজ সমাধানের পথ রাখছে না।
তাদের মতে, যদি দুই পক্ষই নমনীয় না হয়, তাহলে এই আলোচনা শুধু ব্যর্থই হবে না, বরং নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে আলোচনার অগ্রগতি হবে, নাকি নতুন সংঘাতের দিকে পরিস্থিতি যাবে—সেই দিকেই এখন নজর বিশ্ব সম্প্রদায়ের।