প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কুটির ও রপ্তানিমুখী শিল্প চামড়া খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসবের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, কোরবানির একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, বিষয়টি এখন শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, বরং একটি জাতীয় দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো কোরবানির মৌসুমে সংগৃহীত চামড়ার মান রক্ষা করে তা শিল্প ও রপ্তানি খাতে যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক দিকনির্দেশনামূলক সভায় তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিভাগীয় কমিশনার, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। সভাটি আয়োজন করে Ministry of Commerce Bangladesh, যেখানে কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মন্ত্রী বলেন, কোরবানির চামড়া দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি দেশের চামড়া শিল্পের বিকাশ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং এতিমখানা, মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু প্রতিবছরই দেখা যায়, সামান্য অসচেতনতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়, যা অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় সম্পদের অপচয় হিসেবেও বিবেচিত হয়।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার এবার আগাম ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ঈদের আগে দেশের সব মসজিদের খতিব ও ইমামদের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই জুমার খুতবায় চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্ব, সঠিকভাবে পশুর চামড়া ছাড়ানোর পদ্ধতি এবং লবণ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এই বার্তা ছড়িয়ে দিলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি সচেতন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সভায় মন্ত্রী বিভাগীয় কমিশনারদের নির্দেশ দেন, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের সক্রিয়তা বাড়াতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং সংশ্লিষ্টদের জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চামড়া সংরক্ষণ কৌশল শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোরবানির পরপরই সঠিকভাবে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা যায়।
এছাড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ঈদের সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ কার্যক্রমও সমন্বিতভাবে মনিটর করতে হবে। নগর এলাকায় দ্রুত চামড়া সংগ্রহ ও নিরাপদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে বড় ধরনের অপচয়ের আশঙ্কা থাকে, যা এড়াতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
সভায় জানানো হয়, চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় সরকার দেশব্যাপী মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের জন্য ইতোমধ্যে ১৭ কোটির বেশি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কোরবানির পরপরই চামড়ায় সঠিকভাবে লবণ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে, যাতে তা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণযোগ্য থাকে এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায়।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য উপজেলা পর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা এবং জেলা পর্যায়ে ৭৫ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ স্থানীয় পর্যায়ে কর্মশালা, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয় কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ৩ লাখ পোস্টার ও ৮ লাখ লিফলেট বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি টেলিভিশন, রেডিও, জাতীয় পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে। ঈদের তিন দিন আগে থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সচেতনতামূলক তথ্যচিত্র প্রচার করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজভাবে চামড়া সংরক্ষণের নিয়মগুলো জানতে পারে।
সভায় গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনায় বলা হয়, কোরবানির পর ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। গরুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণ এবং ছাগলের ক্ষেত্রে আলাদা পরিমাণ লবণ ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বায়ু চলাচলসমৃদ্ধ স্থানে চামড়া সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তা নিরাপদে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, পশুর হাটে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে এবং চামড়া বিনষ্টকারী কোনো ধরনের অপপ্রচার বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। সড়ক ও মহাসড়কের পাশে পশুর হাট না বসানোর সিদ্ধান্তও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে পরিবহন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় কোনো বিঘ্ন না ঘটে।
সভাটি পরিচালনা করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি জানান, জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এবার কোরবানির মৌসুমে একটি চামড়াও নষ্ট হবে না। তিনি বলেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, বরং জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি বড় অর্জন হবে।
সব মিলিয়ে সরকারের এই উদ্যোগকে চামড়া শিল্পের পুনরুদ্ধার, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে নেওয়া এই প্রস্তুতি সফল হলে দেশের চামড়া খাত নতুন করে গতি ফিরে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।