প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে মাটিচাপা অবস্থায় মা ও শিশুকন্যার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। নিখোঁজের প্রায় ১০ দিন পর কলাবাগানের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হওয়া মরদেহ দুটির ঘটনাকে ঘিরে উঠে এসেছে পারিবারিক কলহ, পরকীয়ার অভিযোগ, সামাজিক সালিশ এবং রহস্যজনক নিখোঁজের নানা তথ্য। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্কজনিত জটিলতা এবং প্রতিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ফরিদপুর সদর উপজেলার চর মাধবদিয়া ইউনিয়নের একটি নির্জন কলাবাগান থেকে উদ্ধার করা হয় নারী ও শিশুর মরদেহ। নিহতরা হলেন জাহানারা বেগম এবং তার চার বছর বয়সী মেয়ে সামিয়া আক্তার। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে জাহানারার স্বামী আমজাদ শেখ এবং উজ্জ্বল নামে এক যুবককে, যাকে স্থানীয়রা জাহানারার কথিত পরকীয়া প্রেমিক হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক আর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কলাবাগানটি সাধারণত নির্জন থাকে। সেখানে মাটির নিচে মা ও শিশুর মরদেহ চাপা দেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। ঘটনাটি সামনে আসে যখন স্থানীয় এক নারী ছাগল চরাতে গিয়ে কুকুরের অস্বাভাবিক আচরণ দেখতে পান। পরে কাছে গিয়ে তিনি মাটির নিচে মানুষের পায়ের অংশ দেখতে পান এবং চিৎকার দিলে আশপাশের মানুষ জড়ো হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিহত জাহানারা বেগম স্বামী আমজাদ শেখের সঙ্গে ঢাকার আমিনবাজার এলাকায় একটি ইটভাটায় কাজ করতেন। সেখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন উজ্জ্বল নামের যুবকও। সেই সূত্রেই জাহানারার সঙ্গে উজ্জ্বলের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এর আগেও কয়েকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এমনকি স্বামী আমজাদ শেখ একাধিকবার উজ্জ্বলকে মারধরও করেছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ মে একটি দোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নিতে জাহানারা ও তার পরিবার গ্রামের বাড়িতে আসেন। অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে জাহানারা ওষুধ কেনার কথা বলে শিশুকন্যাকে নিয়ে থেকে যান। এরপর থেকেই তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর ৬ মে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। কিন্তু এরপরও তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিহতের স্বামী আমজাদ শেখ দাবি করেছেন, পুরো ঘটনাটির পেছনে উজ্জ্বল জড়িত। তার অভিযোগ, আগের সালিশ ও বিরোধের জের ধরে প্রতিশোধ নিতেই তার স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। তবে তদন্তকারীরা বিষয়টি একপাক্ষিকভাবে দেখছেন না। কারণ, পুলিশ উভয় পক্ষের বক্তব্যে অসঙ্গতি পেয়েছে এবং ঘটনাটিকে ঘিরে আরও কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য জামাল মোল্লা বলেন, ইটভাটাকে কেন্দ্র করে জাহানারা ও উজ্জ্বলের সম্পর্ক নিয়ে এলাকায় গুঞ্জন ছিল। বিষয়টি পরিবারেও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি বলেন, যেহেতু লাশ উদ্ধারের স্থান উজ্জ্বলের বাড়ির কাছাকাছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তার দিকেই যাচ্ছে। তবে প্রকৃত সত্য বের করে আনতে পুলিশের গভীর তদন্ত প্রয়োজন।
এদিকে জাহানারার বাবা লালন মোল্লা মেয়ের হত্যার বিচার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, মেয়েকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ছোট্ট নাতনিটিও নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
পুলিশ জানিয়েছে, লাশ দুটি উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং মরদেহ গোপনে পুঁতে রাখার ধরন দেখে এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে শুধুমাত্র পরকীয়াকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কিনা, নাকি এর পেছনে আরও কোনো আর্থিক বা পারিবারিক বিরোধ রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মোবাইল ফোনের কললিস্ট, অবস্থান এবং সংশ্লিষ্টদের গতিবিধিও বিশ্লেষণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
স্থানীয়দের মতে, গোয়ালন্দ ও আশপাশের চরাঞ্চলে পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সামাজিক অস্থিরতা ধীরে ধীরে উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থেকে শ্রমজীবী মানুষের কাজ করার কারণে অনেক পরিবারে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। যার জের ধরে নানা সামাজিক সংকট তৈরি হচ্ছে বলেও মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।
মা ও শিশুকন্যার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। নিহত সামিয়ার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। প্রতিবেশীরা বলছেন, শিশুটি অত্যন্ত চঞ্চল ও সবার আদরের ছিল। তার এমন নির্মম পরিণতি কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে খুব দ্রুতই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ।