প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এর মধ্যে ৮ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৪ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। নতুন এই তথ্য দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত নিয়মিত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, একদিনেই শুধু মৃত্যুই নয়, নতুন সংক্রমণ ও সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যাও ব্যাপক হারে বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ১১১ জন শিশু এবং সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ১৯২ শিশু। হাসপাতালগুলোতে ভিড় ও চাপ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৫১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে শনাক্ত করা হয়েছে, আর বাকি ৩৭৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে।
একই সময়ের মধ্যে দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৪১৬ শিশু। সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ শিশু। এই বিপুল সংখ্যক আক্রান্ত শিশু চিকিৎসাধীন থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো টিকা না পাওয়া, অপুষ্টি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এই রোগকে আরও মারাত্মক করে তোলে। বর্তমানে যেসব শিশু মারা যাচ্ছে, তাদের বড় একটি অংশই টিকাদান কর্মসূচির বাইরে ছিল বা সময়মতো টিকা গ্রহণ করেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীত ও বসন্ত মৌসুমে হাম সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেলেও এবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তারা মনে করছেন, টিকাদান কার্যক্রমে কিছু এলাকায় ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার চাপ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শিশু রোগী ভর্তি করার জন্য শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক জায়গায় একাধিক শিশুকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও সক্রিয় করা হয়েছে যাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। একবার এই রোগ ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই এখনই ব্যাপক টিকাদান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তারা আরও বলেন, অনেক পরিবার এখনো টিকার গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝে না বা নানা ভ্রান্ত ধারণার কারণে শিশুদের টিকা দিতে অনীহা দেখায়। এই প্রবণতা পরিবর্তন করা জরুরি।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত মেডিকেল টিম মাঠে নামানো হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের প্রতি চিকিৎসকদের আহ্বান, শিশুদের মধ্যে জ্বর, চামড়ায় দাগ, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। একইসঙ্গে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সব টিকা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
দেশে ক্রমবর্ধমান এই সংক্রমণ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।