নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শীর্ষ ক্যানসারগুলো

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
যে ৭ ক্যানসারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন নারীরা

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ক্যানসারকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও জীবনযাপন, পরিবেশগত প্রভাব, জিনগত কারণ এবং সচেতনতার অভাবে নারীদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্যানসারের চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও দেরিতে ধরা পড়লে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

মানবদেহে কোষের অস্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধি থেকেই ক্যানসারের সূচনা হয়। এই কোষগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। নারীদের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়, যা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সতর্কতা জারি করে আসছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, নারীদের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা লক্ষণ কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক সময় সাধারণ মনে হওয়া উপসর্গই বড় কোনো রোগের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতন জীবনযাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস পরিহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ক্যানসারগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে স্তন ক্যানসার। বিশ্বব্যাপী এটি নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্ণীত ক্যানসার হিসেবে বিবেচিত। স্তনের কোষে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শুরু হলে এই রোগ দেখা দেয়। স্তনে গাঁট অনুভব, আকার পরিবর্তন, ত্বকে টান বা ডিম্পল, নিপল থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ এবং ব্যথা এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। সময়মতো ম্যামোগ্রাম ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব হয়, যা চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত রয়েছে ফুসফুস ক্যানসার, যা নারীদের মধ্যে মৃত্যুহারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত। যদিও ধূমপান এর প্রধান ঝুঁকি হিসেবে ধরা হয়, তবে বায়ুদূষণ, পেশাগত কারণে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাবও এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা এবং কাশির সঙ্গে রক্ত আসা এর সাধারণ উপসর্গ।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্যানসার হলো কোলোরেক্টাল ক্যানসার, যা কোলন বা রেকটামে সৃষ্টি হয়। এই রোগে আক্রান্ত হলে মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন, রক্তপাত, পেটে অস্বস্তি এবং অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এটি ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়, ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চতুর্থ স্থানে রয়েছে সার্ভিকাল ক্যানসার, যা জরায়ুর নিচের অংশ সার্ভিক্সে হয়। মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি সংক্রমণ এই ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ। অস্বাভাবিক রক্তপাত, পেলভিক ব্যথা এবং অস্বাভাবিক স্রাব এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং এইচপিভি ভ্যাকসিন গ্রহণ এই রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পঞ্চম ক্যানসারটি হলো থাইরয়েড ক্যানসার, যা গলার থাইরয়েড গ্রন্থিতে দেখা যায়। গলায় গাঁট অনুভব, গিলতে অসুবিধা এবং কণ্ঠস্বর পরিবর্তন এর প্রধান লক্ষণ। তুলনামূলকভাবে এটি ধীরে অগ্রসর হলেও সময়মতো চিকিৎসা না নিলে জটিলতা বাড়তে পারে।

ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ওভারিয়ান ক্যানসার, যা ডিম্বাশয়ে সৃষ্টি হয়। এটি অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ করে না, ফলে দেরিতে ধরা পড়ে। পেট ফাঁপা, পেটে ব্যথা, দ্রুত পেট ভরে যাওয়া এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রয়োজন অনুভব করা এর সাধারণ উপসর্গ হিসেবে বিবেচিত।

সপ্তম ক্যানসার হলো এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার, যা জরায়ুর ভেতরের স্তরে হয়। বিশেষ করে মেনোপজের পর নারীদের মধ্যে অস্বাভাবিক রক্তপাত এই রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। এছাড়া পেলভিক ব্যথা এবং স্রাবের পরিবর্তনও এর লক্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাত ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা এবং সময়মতো পরীক্ষা করানো। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা লজ্জা, অবহেলা বা সচেতনতার অভাবে প্রাথমিক লক্ষণগুলো উপেক্ষা করেন, যা পরবর্তীতে রোগকে জটিল করে তোলে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, ব্যায়াম, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণকে ক্যানসার প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্যানসার রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা সেবার সীমাবদ্ধতা অনেক সময় রোগ নির্ণয় বিলম্বিত করে।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবার ও সমাজের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে উৎসাহ দেওয়া, প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চিকিৎসা গ্রহণে সহযোগিতা করা ক্যানসার প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে নারীদের মধ্যে ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা, আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণই পারে এই ভয়াবহ রোগ থেকে নারীদের জীবন রক্ষা করতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত