লাইনচ্যুতে থেমে গেল খুলনা-উত্তরবঙ্গ রেলপথ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
লাইনচ্যুতে থেমে গেল খুলনা-উত্তরবঙ্গ রেলপথ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর এলাকায় মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় খুলনার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়েছে। বুধবার দিবাগত গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের সব ধরনের ট্রেন চলাচল। ফলে রাত থেকেই বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়েন শত শত যাত্রী। অনেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে চরম দুর্ভোগে পড়েন। একই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য পরিবহনেও দেখা দিয়েছে অস্থিরতা।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, বুধবার (২০ মে) দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে কোটচাঁদপুর রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। ট্রেনটি খুলনা থেকে উত্তরাঞ্চলের দিকে যাচ্ছিল। ট্রেনটি ঘটনাস্থল অতিক্রম করার সময় হঠাৎ করেই লাইনের একটি অংশ বসে যায়। এতে ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইন থেকে ছিটকে পড়ে। দুর্ঘটনার পরপরই ওই রুটে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

কোটচাঁদপুর স্টেশন মাস্টার নয়ন আলী জানান, রাতের বেলায় মালবাহী ট্রেনটি পার হওয়ার সময় রেললাইন বসে যাওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পাওয়ার পর খুলনা থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে এবং উদ্ধার কাজ শুরু হয়েছে। রেললাইন মেরামত এবং বগিগুলো সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে রেলওয়ে প্রকৌশলী, নিরাপত্তাকর্মী এবং উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ছুটে যান। রাতভর তারা উদ্ধার ও মেরামত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে দুর্ঘটনার কারণে খুলনা থেকে রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর ও অন্যান্য উত্তরাঞ্চলগামী ট্রেনগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে যাত্রীদের পাশাপাশি পণ্যবাহী পরিবহন ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছে।

খুলনা রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি আন্তঃনগর ও লোকাল ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকে রাখা হয়েছে। অনেক যাত্রী রাতভর স্টেশনে অপেক্ষা করেছেন। কেউ কেউ বিকল্প যানবাহনের সন্ধানে স্টেশন ত্যাগ করেছেন। বিশেষ করে বয়স্ক যাত্রী, নারী ও শিশুদের দুর্ভোগ ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোর হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে।

যশোর, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকার যাত্রীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও শুরুতে তারা সঠিক তথ্য পাননি। ফলে যাত্রীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুত তথ্য সরবরাহ ও বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়ে যাত্রীদের পরিষ্কারভাবে জানানো হয়নি।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অনেক পুরোনো রেলপথে নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ভারবাহী মালবাহী ট্রেন চলাচল এবং পুরোনো রেললাইনের দুর্বল অবস্থা একসঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের আগে রেললাইন ও স্লিপারের অবস্থা পরীক্ষা করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাতে বিকট শব্দ শুনে অনেকেই বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন। ঘটনাস্থলের আশপাশে কিছু সময়ের জন্য মানুষের ভিড়ও জমে যায়। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, যা স্থানীয়দের জন্য স্বস্তির বিষয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেলসেবার আধুনিকায়নে নানা উদ্যোগ নিলেও এখনও বিভিন্ন রুটে অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে মালবাহী ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে রেললাইনের বহনক্ষমতা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি।

এদিকে দুর্ঘটনার পর যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়লেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিয়েছে। উদ্ধারকারী ট্রেনের সহায়তায় লাইনচ্যুত বগিগুলো সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন সংস্কারের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে দ্রুত ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করা যায়।

রেলপথে দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া, সিগন্যাল বিভ্রাট কিংবা রেলক্রসিং দুর্ঘটনার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রতিবারই তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু দুর্ঘটনার পর মেরামত নয়, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সবচেয়ে জরুরি।

খুলনা ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে রেল যোগাযোগ দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই পথে চলাচল করেন। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার কাঁচামাল, কৃষিপণ্য ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য পরিবহনেও এই রুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সাময়িকভাবে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কার্যক্রম শুরু করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রেললাইন বসে যাওয়ার কারণ, ট্রেনের গতি, রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা এবং কারিগরি ত্রুটি ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যাত্রীরা এখন অপেক্ষায় আছেন কবে আবার স্বাভাবিক হবে খুলনা-উত্তরবঙ্গ রেলপথ। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার ও মেরামত কাজ শেষ হলেই পর্যায়ক্রমে ট্রেন চলাচল শুরু করা হবে। তবে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত