প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলার বাজারে আবারও দামের অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে জিরা, এলাচ ও লবঙ্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ মসলা পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের ব্যয়ের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে জিরার কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা, লবঙ্গের কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং এলাচের কেজিতে প্রায় ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এতে করে প্রতিদিনের রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় মসলার ব্যয় সামলাতে গিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগারগাঁও, মহাখালী, তেজকুনিপাড়া ও কারওয়ান বাজারসহ প্রায় সব জায়গাতেই মসলার দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত পণ্য মজুত থাকলেও দামের ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট। ক্রেতার ভিড়ও তুলনামূলক বেশি, তবে অনেকে আগের তুলনায় কম পরিমাণে কেনাকাটা করছেন বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসার কারণে মসলার চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। এই বাড়তি চাহিদার চাপেই বাজারে কিছুটা দাম বৃদ্ধি ঘটেছে। তবে তারা দাবি করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি নেই, বরং পাইকারি বাজার থেকেই দামের পরিবর্তন আসছে।
বাজারে বর্তমান দামের চিত্র অনুযায়ী, মানভেদে প্রতি কেজি জিরা ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। লবঙ্গের কেজি এখন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও আগে ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এলাচ, যার কেজি এক থেকে দেড় মাসের ব্যবধানে প্রায় ৩০০ টাকা বেড়ে এখন ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্য মসলার মধ্যেও দামের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। দারুচিনি ৪৮০ থেকে ৫৫০ টাকা, গোলমরিচ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, তেজপাতা ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, হলুদ ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা, আদা ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, রসুন ৬০ থেকে ২০০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পেঁয়াজের কেজিতেও সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত এক বছরে বিভিন্ন মসলার দামে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, আদা, শুকনা মরিচ ও তেজপাতার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্যদিকে রসুন ও জিরার দামে কিছুটা কমতির প্রবণতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মসলার আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার টন মসলা আমদানি করা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই প্রায় দুই লাখ টন মসলা আমদানি হয়েছে, যা বাজারে সরবরাহ ঘাটতির কোনো ইঙ্গিত দেয় না।
এ কারণে অনেক ক্রেতার অভিযোগ, বাজারে পণ্যের অভাব না থাকলেও দাম বাড়ানো হচ্ছে কৃত্রিমভাবে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে কেনাকাটা করতে আসা এক ক্রেতা মিলন হোসেন বলেন, আগে যে টাকায় পুরো মাসের মসলা কেনা যেত, এখন সেই টাকায় এক সপ্তাহও চলছে না। তার মতে, বাজারে নজরদারি দুর্বল থাকায় কিছু ব্যবসায়ী সুযোগ নিচ্ছেন।
কারওয়ান বাজারের একটি দোকানের মালিক মো. রায়হান বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ক্রেতাদের চাপ বেড়েছে। কেউ কেউ গ্রামে পাঠানোর জন্যও মসলা কিনছেন। পাইকারি বাজারেও দাম কিছুটা বেড়েছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে আমদানিকারকদের ভাষ্য কিছুটা ভিন্ন। তারা বলছেন, মসলার বড় অংশই আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডলার সংকট, এলসি জটিলতা, শুল্ক বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয়ের কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পাইকারি মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনায়েত উল্লাহ দাবি করেন, বাজার এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে এবং দাম স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই আছে। তবে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, ঈদ মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সুযোগে একটি অংশের ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করেন, যা বাজার অস্থিরতার অন্যতম কারণ।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে মসলার বাজারের মৌলিক সমস্যা হলো আমদানিনির্ভরতা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে তথ্যগত স্বচ্ছতার অভাব এবং মনিটরিং দুর্বল হলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে উৎসবকেন্দ্রিক সময়গুলোতে এই পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংস্থার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঈদের আগে প্রতিবছরই মসলাসহ নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরি হয়। অনেক সময় সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও কৃত্রিম সংকটের ধারণা তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতারা মনে করছেন, শুধু আমদানি বাড়ালেই বাজার স্থিতিশীল হবে না, বরং পুরো সরবরাহ চেইনে নজরদারি জোরদার করতে হবে। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না এলে এই অস্থিরতা বারবার ফিরে আসবে।
সব মিলিয়ে, আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মসলার বাজারে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং নীতিগত তদারকির ঘাটতিরও প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এমন মৌসুমি দামের চাপ আরও তীব্র হতে পারে।