প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই—এমন মত উঠে এসেছে অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে। আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, কর কাঠামোর সংস্কার এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) করপোরেট কর কমানো, দ্বৈত কর পরিহার এবং লভ্যাংশ আয়ের ওপর উৎসে করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করার দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা, তথ্যের ঘাটতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে দেশের পুঁজিবাজার কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বারবার ভেঙে পড়ায় এই বাজার এখনও বড় আকারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎসে পরিণত হতে পারেনি। অথচ উন্নত অর্থনীতিতে শেয়ারবাজারই মূলধন জোগানের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
বাজার অংশীজনরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি কাটাতে বাজেটে কিছু সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দাবি, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু সমস্যার আলোচনা নয়, কার্যকর সমাধান দরকার। এক বিনিয়োগকারী বলেন, পুঁজিবাজার পুরোপুরি আস্থার ওপর নির্ভরশীল। আস্থা না ফিরলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না, পুরনো বিনিয়োগকারীরাও বাজার থেকে সরে যাবেন।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে আসন্ন বাজেটে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য কিছু পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, পুঁজিবাজার, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধুমাত্র কর ছাড় বা আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে পুঁজিবাজারের মৌলিক সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বাজার তদারকি ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের মতে, নীতিগত দুর্বলতা এবং তদারকির ঘাটতিই বাজারের আস্থাহীনতার প্রধান কারণ।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) মনে করে, তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর ব্যবধান বাড়ানো হলে আরও প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হবে। সংগঠনটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, কর কাঠামোকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে শেয়ারবাজারে আসা কোম্পানিগুলো বাস্তব সুবিধা পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ বলছেন, কর সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটের মূল কারণ সুশাসনের অভাব। তার মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা, স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কেবল কর ছাড় দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য একটি কার্যকর পুঁজিবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে এ খাতের জন্য কিছু আর্থিক প্রণোদনা রাখা হলেও প্রয়োজনে আরও সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে আলাদা বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকনির্ভরতা এখনো অত্যধিক। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। শক্তিশালী পুঁজিবাজার এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে, যদি সেখানে সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।
বর্তমানে অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, বাজারে নিয়মিত তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকা এবং নীতিগত পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। ফলে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার দিকে ঝুঁকছেন, যা বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু দেশি নয়, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও পুঁজিবাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ এবং লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার বিষয়ে স্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন। এতে বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আসন্ন বাজেট হতে পারে পুঁজিবাজার সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। যদি এই সময় কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারকে ঘিরে বাজেট-পূর্ব এই আলোচনা স্পষ্ট করছে যে, শুধু আর্থিক প্রণোদনা নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসনই এই খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখন সময় সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের।