প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মরক্কোর রাজধানী রাবাত-এ অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে বহুপাক্ষিকতার প্রতি তার অটল অবস্থান বজায় রেখেছে।
বৃহস্পতিবার (২০ মে) সকালে ফ্রাঙ্কোফোন পরিবেশে শান্তিরক্ষা বিষয়ক দ্বিতীয় মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুধু একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নয়, বরং মানবতার প্রতি গভীর নৈতিক অঙ্গীকার।
তিনি আরও বলেন, শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ইতিহাসগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সেনা, পুলিশ ও সিভিল সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে একটি মানবিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। তার মতে, এই নীতিগত অবস্থানই বাংলাদেশের বৈশ্বিক শান্তি উদ্যোগের মূল ভিত্তি।
তিনি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে তিনি শান্তিরক্ষা মিশনে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণকে বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আধুনিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এখন বহু নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে রয়েছে ভুল তথ্যের বিস্তার, ডিজিটাল হয়রানি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নৈতিক ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও বলেন, টেকসই শান্তিরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নয়, বরং নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি। এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট, পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ এবং শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শান্তিকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর প্রবর্তিত এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর নেতৃত্বে আরও শক্তিশালী হওয়া এই নীতি আজও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে দৃঢ় করছে।
তিনি সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা সংস্কার এবং নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের চলমান উদ্যোগগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব কার্যক্রম টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করছে।
নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা (Women, Peace and Security) এজেন্ডার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আধুনিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ এখন অপরিহার্য। শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রী আধুনিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, ভুল তথ্য, সাইবার হয়রানি এবং প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নৈতিক নির্দেশিকা জরুরি।
তিনি বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং-এর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তার মতে, প্রাক-মোতায়েন প্রশিক্ষণ আরও উন্নত করা গেলে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক মিশনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
এছাড়া তিনি পরিবেশবান্ধব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
এই সম্মেলনটি মরক্কো ও ফ্রান্স সরকারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। প্রথমবার এই ধরনের সম্মেলন ২০১৬ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারের আয়োজনকে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্মেলনের পাশাপাশি সন্ধ্যায় রাবাতের ফোর সিজনস হোটেলে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল গ্রোথ কনফারেন্স ২০২৬-এও অংশ নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সেখানে তিনি “ভূরাজনৈতিক বিভাজনের রাজনীতি: ক্ষমতা, উত্তেজনা ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস” শীর্ষক সেশনে মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন।
তিনি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, শক্তির ভারসাম্যের রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বিভাজনের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তার মতে, পরিবর্তনশীল বিশ্বে বাংলাদেশ শান্তি, সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিকতার পক্ষে তার অবস্থান অব্যাহত রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে। দীর্ঘদিনের শান্তিরক্ষা অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ভূমিকার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে রাবাত সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুধু একটি কূটনৈতিক উপস্থিতি নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি দেশের ধারাবাহিক ও দৃঢ় অঙ্গীকারেরই পুনঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।