চাঁপাই সীমান্তে গরু চোরাচালান আতঙ্কে খামারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ১৬ বার
চাঁপাই সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে ভারতীয় গরু

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ভারত থেকে গরু চোরাচালানকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আসন্ন কোরবানির ঈদকে ঘিরে সীমান্তের নদীপথ ও দুর্গম চরাঞ্চল ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র অবৈধভাবে গরু প্রবেশ করাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ প্রবণতা চলতে থাকলে দেশের স্থানীয় পশুপালন খাত বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। অন্যদিকে সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও বাস্তবে চোরাচালান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে দাবি স্থানীয়দের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদী ও সীমান্তঘেঁষা চরাঞ্চলগুলো ব্যবহার করে গভীর রাতে গরু পারাপারের ঘটনা ঘটছে। রাত যত গভীর হয়, ততই সক্রিয় হয়ে ওঠে চোরাকারবারিদের একটি চক্র, যারা স্থানীয়ভাবে ‘লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচিত। তারা সীমান্তের ওপার থেকে গরু গ্রহণ করে ধাপে ধাপে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসে। এরপর নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয় হাটবাজার বা নির্দিষ্ট ফার্মে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের একাধিক খামারি অভিযোগ করেছেন, ভারত থেকে আসা গরুর কারণে দেশীয় গরুর ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা বলছেন, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয় এবং শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেক খামার লোকসানের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

শিবগঞ্জ উপজেলার আটরশিয়া গ্রামের এক ক্ষুদ্র খামারি পলাশ উদ্দিন জানান, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ঋণের ওপর ভিত্তি করে তিনি খামার গড়ে তুলেছেন। আসন্ন ঈদে ভালো দামে গরু বিক্রি করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা থাকলেও ভারতীয় গরুর অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ সেই আশাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। তিনি বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মতো ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।”

একই উপজেলার কালুপুর গ্রামের আরেক খামারি জাহিদ হাসান জানান, তিনি তিনটি গরু বিক্রির জন্য হাটে তুললেও প্রত্যাশিত দাম পাননি। তার দাবি, বাজারে তুলনামূলক কম দামে আসা গরুর কারণে দেশীয় গরুর মূল্য কমে যাচ্ছে, ফলে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুনজের আলম মানিক বলেন, করোনা পরবর্তী সময়ে জেলার অনেক খামারি ধার-দেনা করে খামার টিকিয়ে রেখেছেন। এবার ঈদকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হলেও অবৈধ পথে আসা গরুর কারণে সেই আশা ভেস্তে যেতে বসেছে। তিনি সরকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে স্থানীয় খামারিরা ন্যায্য বাজার সুবিধা পান।

সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা Border Guard Bangladesh (বিজিবি) দাবি করেছে, সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, রাতের অন্ধকারে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গরু প্রবেশের চেষ্টা হলেও সেগুলো দ্রুত জব্দ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের সূত্র বলছে, সীমান্ত এলাকায় নদী ও চরাঞ্চলের ভৌগোলিক জটিলতার কারণে পুরোপুরি নজরদারি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে চোরাচালান চক্র বিভিন্ন কৌশলে গরু প্রবেশ করাচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে চক্রের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, অবৈধ গরু প্রবেশ বন্ধ না হলে স্থানীয় খামার শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাপের মধ্যে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিগত নজরদারি বৃদ্ধি, টহল জোরদার এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈধ আমদানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় খামারিরা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকতে পারবেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে এক ধরনের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। একদিকে খামারিরা তাদের বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কিত, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চোরাচালান রোধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার কথা বলছে। সব মিলিয়ে কোরবানির মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের এই পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত