প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো তৌহিদ আফ্রিদিকে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
  • ৩৩ বার

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রতারণার অভিযোগে করা আরেক মামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ উদ্দিন আফ্রিদিকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আদালত। রাজধানীর ওয়ারী থানায় দায়ের করা মামলায় পুলিশের আবেদনের পর সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত এ আদেশ দেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী থানার উপপরিদর্শক মো. মাহফুজুর রহমান তৌহিদ আফ্রিদিকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, মামলার তদন্তে সন্দিগ্ধ আসামি নিশাদুজ্জামান নিশাদকে জিজ্ঞাসাবাদে তৌহিদ উদ্দিন আফ্রিদির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন।

শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা গ্রেপ্তার দেখানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। শুনানিতে আরও অংশ নেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ গোলাম মুর্তজা ইবনে ইসলাম। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী ইকবাল মাহমুদ শোভন গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত পুলিশের আবেদন মঞ্জুর করেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে একটি অনলাইন প্রতারক চক্র ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রথমে বাদীর আস্থা অর্জন করা হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপে টাকা বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হয়। শুরুতে অল্প অঙ্কের টাকা ফেরত দিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। পরে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী সৈয়দা আশফাহ তোয়াহা দ্যূতির অভিযোগ, চক্রটি মুনাফাসহ অর্থ ফেরতের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কাছ থেকে মোট ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এই ঘটনায় তিনি ওয়ারী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্তের এক পর্যায়ে সন্দিগ্ধ আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে তৌহিদ আফ্রিদির নাম আসে বলে পুলিশের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৌহিদ আফ্রিদি দেশের পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের একজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বড় অনুসারী গোষ্ঠী রয়েছে। বিনোদনধর্মী ভিডিও, ভ্লগ ও অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে তিনি তরুণদের মধ্যে পরিচিতি পান। তিনি বেসরকারি টিভি চ্যানেল মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথীর ছেলে হিসেবেও পরিচিত। ফলে তার বিরুদ্ধে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর খবর দ্রুত আলোচনায় আসে।

তবে আদালতের এই আদেশ মানে দোষ প্রমাণ নয়। এটি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। কোনো মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার দেখানো হলে তদন্তকারী সংস্থা তাকে ওই মামলার আসামি হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের দৃষ্টিতে দোষী নন।

এর আগে গত বছরের ২৪ আগস্ট রাতে বরিশাল থেকে তৌহিদ আফ্রিদিকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি পুলিশ। সে সময় তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কেন্দ্রিক একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় বলে সরকারি ও সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। পরে তাকে আন্দোলন ঘিরে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রতারণার মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলো।

অনলাইন প্রতারণা এখন দেশের বড় সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা সমস্যা হয়ে উঠেছে। চাকরি, বিনিয়োগ, অনলাইন আয়, ফ্রিল্যান্সিং, পণ্য বিক্রি, লটারি বা কমিশনের প্রলোভন দেখিয়ে বহু মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। প্রতারক চক্রগুলো সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার করে। শুরুতে তারা অল্প টাকা ফেরত দিয়ে ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন করে। পরে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।

ওয়ারী থানার এই মামলার অভিযোগেও একই ধরনের কৌশলের কথা বলা হয়েছে। চাকরির প্রলোভন, অনলাইন যোগাযোগ, ধাপে ধাপে বিনিয়োগে প্ররোচনা এবং পরে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এই মামলার মূল বিষয়। তদন্তে এখন আদালত, পুলিশ ও প্রসিকিউশন দেখবে, এই প্রতারণার সঙ্গে কার কী ভূমিকা ছিল। তৌহিদ আফ্রিদির বিরুদ্ধে পুলিশের দাবি কতটা প্রমাণভিত্তিক, সেটিও তদন্ত ও আদালতের পর্যায়ে যাচাই হবে।

এই মামলাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহের একটি বড় কারণ হলো আসামির পরিচিতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়। অনেক সময় মানুষ আদালতের আগেই মতামত দিয়ে ফেলেন। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ কোনো অভিযোগ সত্য কি না, তা আদালতই নির্ধারণ করবে। সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা, আবেগ বা পক্ষ-বিপক্ষের প্রচার বিচারিক সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না।

আইনজীবীরা মনে করেন, অনলাইন প্রতারণার মামলায় ডিজিটাল প্রমাণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, টেলিগ্রাম চ্যাট, ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের রেকর্ড, ডিভাইস ফরেনসিক রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের তথ্য তদন্তে বড় ভূমিকা রাখে। এই মামলাতেও তদন্তকারী সংস্থা যদি ডিজিটাল লেনদেন ও যোগাযোগের প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে অভিযোগের প্রকৃতি স্পষ্ট হবে।

ভুক্তভোগী পক্ষের জন্য বিষয়টি অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। প্রতারণার মামলায় অনেক সময় আসামি গ্রেপ্তার হলেও টাকা উদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ প্রতারক চক্রগুলো দ্রুত টাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলে। তাই তদন্তের শুরুতেই অর্থের পথ অনুসরণ করা জরুরি। কোন নম্বর বা অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে, কারা সেই টাকা তুলেছে, এবং চক্রটি কতজনকে প্রতারণা করেছে, এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা দরকার।

অন্যদিকে আসামিপক্ষেরও আইনি অধিকার আছে। তারা আদালতে দাবি করতে পারে, তৌহিদ আফ্রিদির বিরুদ্ধে অভিযোগ ভিত্তিহীন বা তার নাম জিজ্ঞাসাবাদে ভুলভাবে এসেছে। তারা জামিন, নথি পর্যালোচনা এবং অভিযোগের আইনগত বৈধতা নিয়ে আদালতে আবেদন করতে পারে। তাই মামলাটি এখন তদন্ত, শুনানি ও আদালতের পরবর্তী নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে।

তৌহিদ আফ্রিদির বিরুদ্ধে নতুন এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো বিনোদন জগত ও অনলাইন কনটেন্ট অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয়তা এখন শুধু বিনোদনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে ব্যবসা, প্রচার, প্রভাব ও অর্থনৈতিক লেনদেনও যুক্ত। তাই জনপ্রিয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা বা আর্থিক অপরাধের অভিযোগ উঠলে তা বড় জনআলোচনায় পরিণত হয়।

এখন নজর থাকবে মামলার তদন্তের পরবর্তী ধাপে। পুলিশ কি নতুন কোনো রিমান্ড আবেদন করবে, নাকি জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাইবে, তা আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। একই সঙ্গে বাদীপক্ষের অভিযোগ, সন্দিগ্ধ আসামিদের জবানবন্দি এবং ডিজিটাল প্রমাণ কতটা শক্তিশালী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে প্রতারণার মামলায় তৌহিদ আফ্রিদিকে গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনা শুধু একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে ঘিরে আইনি খবর নয়। এটি অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের আইনি দায় নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে শেষ কথা আদালতের। অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে দোষী বলা যাবে না। আর তদন্তে যদি প্রতারণা চক্রের পূর্ণ চিত্র বেরিয়ে আসে, তাহলে তা অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত