সর্বশেষ :
জীবননগরে আইসিটি কর্মকর্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ টানা পাঁচ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা, স্বস্তি মিলতে পারে তাপদাহ থেকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কঠোর নির্দেশনা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি না করার সতর্কবার্তা অবৈধ গ্যাস সংযোগে চুন কারখানা, রাষ্ট্রের কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগে দুইজন কারাগারে কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া হামলা হলে ন্যাটোকে বিধ্বংসী জবাব দেবে রাশিয়া লেবানন সীমান্তে সংঘর্ষে নিহত ৪ ইসরাইলি সেনা, বাড়ছে উত্তেজনা সাঘাটায় যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে শতাধিক পরিবার আড়াই ঘণ্টার পতাকা বৈঠকেও মিলল না ডিপজলের খোঁজ, উদ্বেগে পরিবার সাতক্ষীরায় পৃথক স্থান থেকে তিন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

নাইজারের বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ৩৫

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
  • ২৮ বার

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাইজারের রাজধানী নিয়ামে অবস্থিত দিওরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ বন্দুক হামলায় ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ২২ জন হামলাকারী, ১১ জন নিরাপত্তা সদস্য এবং ২ জন বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকালে এই হামলা হয়। কয়েক ঘণ্টার সংঘর্ষের পর নিরাপত্তা বাহিনী বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়।

দিওরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নাইজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোর একটি। এটি দেশটির প্রধান বেসামরিক বিমানবন্দর হলেও এর ভেতরে সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। সেই কারণে বিমানবন্দরটি শুধু যাত্রী চলাচলের কেন্দ্র নয়। এটি নাইজারের নিরাপত্তা কাঠামোরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন একটি স্থানে সশস্ত্র হামলা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

নাইজারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা ভারী অস্ত্র নিয়ে বিমানবন্দর এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করে। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের তীব্র গোলাগুলি হয়। সংঘর্ষে ২২ হামলাকারী নিহত হয়। আহত অবস্থায় আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০ সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল ও আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে রকেটচালিত গ্রেনেড লঞ্চার, একে-৪৭ রাইফেল, বিস্ফোরক, গ্রেনেড, ওয়াকিটকি এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ জব্দ করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পর বিমানবন্দর এলাকা থেকে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো গাড়ির টায়ার ফেটেছে। কিন্তু পরপর গুলির শব্দে তারা বুঝতে পারেন, বড় ধরনের হামলা চলছে। বিমানবন্দরের কাছাকাছি বসবাসকারী বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘরের ভেতরে অবস্থান নেন।

নিয়ামের বাসিন্দা লাওয়ালি সালহা বিবিসিকে বলেন, ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে তিনি প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। এরপর গুলির শব্দ বাড়তে থাকে। তার ভাষায়, প্রথমে বিষয়টি সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা মনে হলেও দ্রুত বোঝা যায়, বিমানবন্দর এলাকায় হামলা হয়েছে। তার মতো আরও অনেক বাসিন্দা দীর্ঘ সময় আতঙ্কে কাটান।

হামলার দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী জামা’আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন, সংক্ষেপে জেএনআইএম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গোষ্ঠীটি এক বিবৃতিতে হামলার দায় নেয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সাহেল অঞ্চলে সক্রিয় এই গোষ্ঠী মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে হামলা চালিয়ে আসছে।

নাইজারের রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরে এমন হামলা দেশটির সামরিক সরকারের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক বছর ধরে নাইজার জঙ্গি হামলা, সীমান্ত অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। দেশটির পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আল-কায়েদা ও আইএস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। বিশেষ করে মালি ও বুরকিনা ফাসোর সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলার ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

দিওরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নাইজারের বিমানবাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে। পাশাপাশি সাহেল অঞ্চলের তিন দেশ নাইজার, মালি ও বুরকিনা ফাসোর জোট অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটসের সামরিক কাঠামোর সঙ্গেও এই স্থাপনার সম্পর্ক রয়েছে। এই তিন দেশই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক শাসনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা পশ্চিমা নিরাপত্তা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা জোটকে সামনে আনছে।

বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা আগে থেকেই কড়া ছিল। সংশ্লিষ্ট এলাকায় শত শত নজরদারি ক্যামেরা আছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবু হামলাকারীরা কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে পৌঁছাতে পারল, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা শুধু প্রাণহানির ঘটনা নয়। এটি নাইজারের রাজধানী নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে।

হামলার পর বিমানবন্দর এলাকায় সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। শহরের বিভিন্ন সড়কে তল্লাশি বাড়ানো হয়। বিমানবন্দরের আশপাশে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। AP জানিয়েছে, হামলার কয়েক ঘণ্টা পর বিমানবন্দরটি আবার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যায়। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটতে সময় লাগছে।

এটি এ বছর দিওরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দ্বিতীয় বড় হামলা। গত জানুয়ারিতেও বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটি এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে। সেই হামলার দায় স্বীকার করেছিল আইএস-সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী। জানুয়ারির হামলায় নাইজারের নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বেশ কয়েকজন হামলাকারী নিহত হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে আবার একই ধরনের হামলা দেশটির নিরাপত্তা সংকটের গভীরতা দেখাচ্ছে।

নাইজার গত এক দশক ধরে সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। দেশটির বিশাল মরুভূমি এলাকা, দুর্বল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর অস্থিরতা এই লড়াইকে আরও কঠিন করেছে। মালি ও বুরকিনা ফাসোর মতো দেশেও একই ধরনের গোষ্ঠী সক্রিয়। ফলে একটি দেশের নিরাপত্তা সংকট দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

২০২৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর নাইজারের রাজনৈতিক অবস্থাও বদলে যায়। সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে। ফরাসি ও মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমে যায়। এরপর দেশটি মালি ও বুরকিনা ফাসোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ায়। কিন্তু জঙ্গি হামলা কমেনি। বরং রাজধানীর মতো উচ্চ নিরাপত্তা এলাকায় হামলা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হামলায় নিহত ১১ নিরাপত্তা সদস্যের পরিবার এখন শোকের মধ্যে। দুই বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিমানবন্দর সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। সেখানে এমন হামলা হলে শুধু সেনা বা পুলিশ নয়, সাধারণ যাত্রী, কর্মী, দোকানদার ও আশপাশের বাসিন্দারাও ঝুঁকিতে পড়েন।

আন্তর্জাতিকভাবে এই হামলা সাহেল অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য সতর্কবার্তা। আফ্রিকার এই অঞ্চলে আল-কায়েদা ও আইএস-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো অনেক জায়গায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করছে। তারা সামরিক ঘাঁটি, সীমান্ত চৌকি, গ্রাম, সড়কপথ এবং এখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করছে। এতে শুধু প্রাণহানি নয়, অর্থনীতি, বিমান চলাচল, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগও ঝুঁকিতে পড়ে।

নাইজারের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হামলার পর জেএনআইএমের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান শুরু হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ এবং স্থানীয় সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা করছে নিরাপত্তা বাহিনী। তবে এমন অভিযান কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার ওপর।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে সাহেল অঞ্চলের সংকট সমাধান কঠিন। দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্থানীয় মানুষের আস্থা, সীমান্ত সমন্বয়, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন। কারণ জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো অনেক সময় দুর্বল প্রশাসন, দারিদ্র্য ও ক্ষোভকে কাজে লাগায়। তাই নিরাপত্তা অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমাধানও জরুরি।

দিওরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৃহস্পতিবারের হামলা তাই শুধু নাইজারের একটি সন্ত্রাসী ঘটনা নয়। এটি পুরো সাহেল অঞ্চলের চলমান সংকটের প্রতিচ্ছবি। ৩৫ জনের মৃত্যু, বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় হামলা, জেএনআইএমের দায় স্বীকার এবং আগের আইএস-সম্পৃক্ত হামলার স্মৃতি মিলিয়ে নাইজার এখন কঠিন নিরাপত্তা পরীক্ষার মুখে।

হামলার পর বিমানবন্দর চালু হলেও মানুষের মনে ভয় রয়ে গেছে। নিয়ামের বাসিন্দারা এখন জানতে চান, এমন নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় হামলা কীভাবে সম্ভব হলো। নিহতদের পরিবার জানতে চায়, তাদের স্বজনদের মৃত্যু কি শেষ হবে, নাকি আরও হামলার আশঙ্কা রয়ে গেল। আর নাইজারের সরকারকে এখন প্রমাণ করতে হবে, রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় তারা আরও শক্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত