সর্বশেষ :
জীবননগরে আইসিটি কর্মকর্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ টানা পাঁচ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা, স্বস্তি মিলতে পারে তাপদাহ থেকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কঠোর নির্দেশনা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি না করার সতর্কবার্তা অবৈধ গ্যাস সংযোগে চুন কারখানা, রাষ্ট্রের কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগে দুইজন কারাগারে কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া হামলা হলে ন্যাটোকে বিধ্বংসী জবাব দেবে রাশিয়া লেবানন সীমান্তে সংঘর্ষে নিহত ৪ ইসরাইলি সেনা, বাড়ছে উত্তেজনা সাঘাটায় যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে শতাধিক পরিবার আড়াই ঘণ্টার পতাকা বৈঠকেও মিলল না ডিপজলের খোঁজ, উদ্বেগে পরিবার সাতক্ষীরায় পৃথক স্থান থেকে তিন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা প্রকল্প ভাবছে সরকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
  • ২৯ বার

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর না করার চিন্তা করছে সরকার। এর বদলে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর আগে তিস্তা প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে এখন সরকার অর্থায়ন, ঋণের শর্ত, প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আজ শুক্রবার পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদসহ একটি প্রতিনিধিদলের তিস্তা ব্যারাজ এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা, নদীভাঙন, পানিপ্রবাহ, সেচ সুবিধা, সম্ভাব্য নদী শাসন এবং স্থানীয় মানুষের চাহিদা সরেজমিনে দেখা হবে। একনেক সভায় প্রকল্প প্রস্তাব তোলার আগে আরও বিস্তারিত সমীক্ষা করার কথাও জানা গেছে।

তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি এবং পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার লাখো মানুষ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব তাদের কৃষিকাজকে কঠিন করে তোলে। আবার বর্ষায় তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন ঘরবাড়ি, জমি, রাস্তা ও ফসল কেড়ে নেয়। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকা, কাজের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, তিস্তা নদীকেন্দ্রিক টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমীক্ষা এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সেই সমীক্ষায় ১১০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও মেরামত এবং ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তা অববাহিকায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা। নদী খনন হলে পানিপ্রবাহ বাড়তে পারে। পরিকল্পিত বাঁধ ও নদী শাসন ভাঙন কমাতে সহায়তা করতে পারে। পুনরুদ্ধার করা ভূমি কৃষি, বসতি, শিল্প বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। বাঁধের ওপর রাস্তা হলে যোগাযোগও সহজ হবে। এতে পণ্য পরিবহন খরচ কমতে পারে এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাও শক্ত হতে পারে।

তবে প্রকল্পটি যত বড়, ঝুঁকিও তত বড়। তিস্তা একটি আন্তসীমান্ত নদী। এর উজান ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশের অংশে নদীর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হলে পানিপ্রবাহ, পলি, পরিবেশ, ভাঙন, সেচ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সব দিক বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণ করলেই স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা না করলে নতুন সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে, তা বিদেশি ঋণ দিয়ে না করে নিজস্ব অর্থায়নে করার বিষয়ে সরকার আগ্রহী। সরকারের এই ভাবনার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। বিদেশি ঋণ নিলে সুদ, শর্ত, পরিশোধের চাপ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর দাতাপক্ষের প্রভাব থাকে। অন্যদিকে নিজস্ব অর্থায়ন হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বেশি থাকে। তবে এতে জাতীয় বাজেটের ওপর চাপও তৈরি হতে পারে।

তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহ নতুন নয়। কয়েক বছর আগে চীনা বিশেষজ্ঞরা প্রকল্প নিয়ে প্রাথমিক সমীক্ষা করে একটি ধারণাপত্র দেয়। এতে প্রকল্প ব্যয় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। চীনের সহায়তায় নদী ড্রেজিং, বাঁধ নির্মাণ, জলাধার, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের বিষয় আলোচনায় আসে। বেইজিং দক্ষিণ এশিয়ায় অবকাঠামো সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। তাই তিস্তা প্রকল্প তাদের কাছে কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কিন্তু তিস্তা প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও যুক্ত। ভারত দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় আছে। ১৯৮৩ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি অস্থায়ী সমঝোতা হয়েছিল। সেখানে তিস্তার পানির ৩৯ শতাংশ ভারত এবং ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশের জন্য নির্ধারণের কথা ছিল। কিন্তু সেটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপ নেয়নি। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা আটকে যায়।

এরপর বহুবার তিস্তা চুক্তির আলোচনা হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসেনি। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ তাই দীর্ঘদিন ধরে হতাশ। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা শুকিয়ে যায়। বর্ষায় আবার নদী ভয়ংকর হয়ে ওঠে। স্থানীয় মানুষ বলেন, নদী কখনো পানি দেয় না, আবার কখনো সব নিয়ে যায়। এই বাস্তবতার কারণেই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে তারা জরুরি মনে করেন।

ভারতের দৃষ্টিতে তিস্তা প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্বও আছে। তিস্তা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশ ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি। এই করিডোর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করে। তাই ওই অঞ্চলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিয়ে দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকতে পারে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতও তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহী। দিল্লি চাইতে পারে, প্রকল্পটি যেন চীনের প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে।

এই অবস্থায় সরকারের জন্য সিদ্ধান্তটি সহজ নয়। চীনের অর্থায়ন নিলে দ্রুত অর্থ পাওয়া যেতে পারে। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগতে পারে। কিন্তু ঋণের শর্ত, কূটনৈতিক চাপ এবং ভারতের উদ্বেগ বিবেচনা করতে হবে। আবার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প করলে কূটনৈতিক ঝুঁকি কমতে পারে। তবে সময় বেশি লাগতে পারে এবং বাজেটে বড় চাপ পড়তে পারে।

তিস্তা এলাকায় চলমান ভাঙনরোধী কাজও গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকায় বিগত ও চলতি অর্থবছরে ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ চলছে। এর মধ্যে রংপুর-৪ সংসদীয় এলাকার তিস্তা নদীর অংশে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজও অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজ চলতি মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় মানুষের কাছে এসব কাজ জরুরি। কারণ ভাঙন মানে শুধু জমি হারানো নয়। ভাঙন মানে ঘর হারানো। স্কুল হারানো। কবরস্থান, মসজিদ, রাস্তা, বাজার ও জীবিকার পথ হারানো। বহু পরিবার এক রাতের মধ্যে নিঃস্ব হয়ে যায়। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে ওঠে। কেউ বাঁধের পাশে আশ্রয় নেয়। কেউ শহরে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করে। তাই তিস্তা প্রকল্পের মানবিক দিকটি বড়।

তবে নদী নিয়ে যেকোনো বড় প্রকল্পে পরিবেশগত সতর্কতাও দরকার। নদীকে শুধু খাল বা সোজা জলপথ বানানোর চেষ্টা করলে প্রকৃতি প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ড্রেজিং কোথায় হবে, পলি কোথায় রাখা হবে, বাঁধ কতটা উঁচু হবে, মাছের চলাচল কীভাবে থাকবে, বন্যার পানি কোথায় যাবে, এসব বিষয়ে গভীর গবেষণা দরকার। স্থানীয় মানুষের মতামতও নিতে হবে। কারণ নদীর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বসবাস করেন তারাই।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের ভাবনা তাই একদিকে অর্থনৈতিক সাহসের বার্তা। অন্যদিকে এটি সতর্ক কূটনীতিরও ইঙ্গিত। তিস্তা বাংলাদেশের জন্য জীবনরেখা। এই প্রকল্পে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাড়াহুড়া করলে চলবে না। আবার দীর্ঘসূত্রতাও মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে। তাই দ্রুত, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত দরকার।

সব মিলিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন, পানি অধিকার, কৃষি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠেছে। চীনের অর্থায়ন নেওয়া হবে কি না, সেটি শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের নীতি, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত। সরকার শেষ পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নে এগোলে প্রকল্পের ওপর জাতীয় মালিকানা বাড়বে। তবে তখন বাস্তবায়ন সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং সময় ব্যবস্থাপনা বড় পরীক্ষা হবে।

তিস্তার পাড়ের মানুষের কাছে বিষয়টি আরও সহজ। তারা চায় নদী বাঁচুক। ভাঙন থামুক। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকুক। কৃষক সেচ পাক। ঘরবাড়ি নিরাপদ থাকুক। আর তাদের সন্তানরা যেন প্রতি বছর নদীভাঙনের ভয় নিয়ে বড় না হয়। তিস্তা প্রকল্পের আসল লক্ষ্যও তাই হওয়া উচিত মানুষের জীবন বদলানো। অর্থায়ন যেভাবেই হোক, সেই মানবিক লক্ষ্য যেন হারিয়ে না যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত