প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো জোটে না গিয়ে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপি। দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করতে সহায়তা করবে। তবে তারা এটিও স্বীকার করেছেন, এককভাবে নির্বাচন করলে কিছু এলাকায় ভোট বিভাজনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আত্মপ্রকাশের এক বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছয়টি আসন পায় তরুণ নেতৃত্বাধীন এনসিপি। সেই নির্বাচনের পর দলটির ভেতরে নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়। জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা পেলেও তৃণমূলের শক্তি বাড়ানো এখন তাদের বড় লক্ষ্য। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলটি সাংগঠনিক বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখছে।
দলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের চেয়ে আরও বেশি গতিতে চলছে। তার ভাষায়, দল এখন দুটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যেসব এলাকায় কমিটি নেই, সেখানে নতুন কমিটি গঠন করা হচ্ছে। আর যেসব এলাকায় আগের কমিটি আছে, সেগুলোর কাজ ও সক্ষমতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হচ্ছে।
সারজিস আলম বলেন, এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে দলের কিছু লাভ হবে। এতে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত হবে। নির্বাচনের প্রয়োজনে প্রতিটি এলাকা, এমনকি ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এতে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়বে। তবে তিনি এটিও বলেন, একক লড়াইয়ের কারণে ভোট ভাগ হতে পারে। ফলে কিছু জায়গায় জয়ের সম্ভাবনা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, দলটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে নির্বাচন কবে হবে এবং কোন পদ্ধতিতে হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা আছে। তাই জোট নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। তার বক্তব্যে বোঝা যায়, এনসিপি আপাতত জোটের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছে না। তবে মাঠের প্রস্তুতিতে একক অবস্থানকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির চেয়ে ভিন্ন। এখানে দলীয় প্রতীক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় কাজ, পারিবারিক প্রভাব এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বড় ভূমিকা রাখে। তাই এনসিপির মতো নতুন দলের জন্য এই নির্বাচন বড় পরীক্ষা। শুধু কেন্দ্রীয় জনপ্রিয়তা দিয়ে স্থানীয় ভোটে ভালো করা কঠিন। দরকার ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি পর্যায়ে টেকসই সংগঠন।
এনসিপির নেতৃত্ব বিষয়টি বুঝতে পারছে বলেই স্থানীয় নির্বাচনকে দল গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে। জাতীয় নির্বাচনে সীমিত আসন পেলেও দলটি তরুণ ভোটারদের একাংশের নজর কাড়তে পেরেছিল। কিন্তু সে সমর্থনকে স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে তৃণমূল কাঠামো দরকার। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সেই কাঠামো তৈরির বাস্তব ক্ষেত্র হতে পারে।
আসিফ মাহমুদ জানান, দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন কাউকে এনসিপিতে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সতর্ক। অনেক রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি যোগাযোগ করলেও দল সচেতনভাবে তাদের অনেককে গ্রহণ করেনি। কারণ এমন কেউ দলে এলে স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তার ভাষায়, দল শুধু শক্তি বাড়ানোর জন্য কাউকে নিতে চায় না। দলীয় মূল্যবোধ ও ভাবমূর্তিও দেখতে চায়।
এই অবস্থান এনসিপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন দলগুলোর সামনে বড় ঝুঁকি থাকে দ্রুত বিস্তারের চাপে বিতর্কিত ব্যক্তি দলে নেওয়া। এতে অল্প সময়ের জন্য সাংগঠনিক শক্তি বাড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দলের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এনসিপি নিজেকে পুরোনো রাজনীতির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চাইলে প্রার্থী বাছাই ও সদস্য অন্তর্ভুক্তিতে সতর্কতা তাদের জন্য অপরিহার্য।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির রাজনৈতিক পরিচয়ও পরিষ্কার করতে পারে। জাতীয় নির্বাচনে দলটি জোট বা সমঝোতার রাজনীতির কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তরুণদের একটি অংশ চেয়েছিল, এনসিপি যেন আলাদা রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করে। তাই স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রস্তুতি দলটিকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যার সুযোগ দেবে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে এনসিপিকে। অনেক এলাকায় প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর ভোটব্যাংক আছে। তাদের দীর্ঘদিনের কর্মী, সমর্থক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। এনসিপিকে সেখানে নতুন সংগঠন দাঁড় করাতে হবে। শুধু তরুণ নেতৃত্বের আবেদন দিয়ে সব জায়গায় ফল পাওয়া যাবে না।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, এনসিপির প্রার্থী কারা হবেন। স্থানীয় নির্বাচনে ভালো প্রার্থী না পেলে দলীয় কৌশল কাজ করবে না। প্রার্থীকে এলাকায় পরিচিত হতে হবে। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার রেকর্ড থাকতে হবে। দুর্নীতি, দখল, সহিংসতা বা স্বার্থের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে নতুন দলের ইমেজ নষ্ট হবে। তাই এনসিপির প্রার্থী বাছাই হবে তাদের বড় পরীক্ষা।
দলটি এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপ দাবি করেছে। নির্বাচনের সময়সূচি, পদ্ধতি ও আইনগত কাঠামো স্পষ্ট না হলে দলগুলো পরিকল্পনা করতে পারে না। এনসিপি বলছে, অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নয়, পরিষ্কার রোডম্যাপ দরকার। নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত সময় পেলে তারা প্রার্থী নির্বাচন, প্রচার, সংগঠন ও ভোটকেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে পারবে।
এনসিপির জন্য স্থানীয় নির্বাচন আরেক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদে ছয়টি আসন থাকলেও স্থানীয় সরকারে ভালো ফল করলে দলটির জনভিত্তি সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যাবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে যদি তারা দৃশ্যমান ফল করে, তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের দরকষাকষির শক্তি বাড়বে। আবার খারাপ ফল হলে তরুণ নেতৃত্বের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
ভোট বিভাজনের ঝুঁকির বিষয়টি সারজিস আলম নিজেই স্বীকার করেছেন। স্থানীয় নির্বাচনে অনেক সময় কাছাকাছি মতাদর্শের একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রতিপক্ষ সুবিধা পায়। এনসিপি এককভাবে লড়লে কিছু এলাকায় বিরোধী ভোট ভাগ হতে পারে। আবার অন্য এলাকায় নতুন ভোটার ও তরুণ ভোট একত্র করলে তারা চমকও দেখাতে পারে। তাই একক লড়াই দলটির জন্য একই সঙ্গে ঝুঁকি ও সুযোগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নতুন দলের জন্য সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে দরকারি মাঠ। এখানে ভোটাররা নেতাকে সরাসরি চেনেন। তারা জানেন, কে এলাকায় কাজ করেছে আর কে শুধু বড় বক্তব্য দেয়। তাই এনসিপিকে ভোটারদের কাছে যেতে হবে বাস্তব ইস্যু নিয়ে। রাস্তা, ড্রেন, পানি, বাজার, স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় দুর্নীতি এবং যুব কর্মসংস্থান নিয়ে পরিষ্কার পরিকল্পনা দিতে হবে।
এনসিপি যদি শুধু জাতীয় রাজনীতির ভাষণ নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে নামে, তবে ফল সীমিত হতে পারে। কিন্তু যদি তারা প্রতিটি এলাকার বাস্তব সমস্যা বুঝে প্রার্থী ও কর্মসূচি সাজায়, তাহলে তরুণ দল হিসেবে নতুন জায়গা তৈরি করতে পারে। ভোটাররা এখন স্থানীয় প্রতিনিধির কাছ থেকে সরাসরি কাজ চান। বড় স্লোগানের চেয়ে বাস্তব সেবা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দলের সাংগঠনিক সংস্কারও তাই গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো কমিটির কাজ মূল্যায়ন, নিষ্ক্রিয় কমিটি বদল, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম এনসিপির জন্য জরুরি। শুধু কেন্দ্রীয় নেতাদের জনপ্রিয়তা দিয়ে স্থানীয় নির্বাচন জেতা যায় না। ভোটের দিন কেন্দ্র পাহারা, এজেন্ট দেওয়া, ভোটার আনা এবং ফলাফল পর্যবেক্ষণের জন্য শক্ত সংগঠন দরকার।
আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে আরেকটি বার্তা স্পষ্ট। এনসিপি দলে প্রভাবশালী মুখ আনতে চায়, কিন্তু যে কোনো মূল্যে নয়। তারা চাইছে না, বিতর্কিত বা সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা নতুন দলের পরিচ্ছন্নতার দাবি নষ্ট করুক। তবে বাস্তবে এই নীতি ধরে রাখা কঠিন। কারণ স্থানীয় নির্বাচনে অনেক জায়গায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছাড়া ভোট সংগঠিত করা কঠিন হয়। তাই নীতি ও বাস্তবতার ভারসাম্য রাখাই হবে দলটির বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে শুধু ভোটের লড়াই হিসেবে দেখছে না। তারা এটিকে দল গঠন, তৃণমূল বিস্তার এবং রাজনৈতিক পরিচয় পরিষ্কার করার সুযোগ হিসেবে দেখছে। এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি সেই কৌশলের অংশ। তবে সামনে পথ সহজ নয়। সংগঠন, প্রার্থী, অর্থ, প্রচার, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সব ক্ষেত্রেই দলটিকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে।
এনসিপির জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা। তারা যদি স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দাঁড় করাতে পারে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দল গড়তে পারে এবং ভোটারদের বাস্তব সমস্যাকে সামনে আনতে পারে, তাহলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পাবে। আর যদি সংগঠন দুর্বল থাকে বা প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হয়, তাহলে একক লড়াই ভোট বিভাজনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষতিও ডেকে আনতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপির একক অংশগ্রহণ তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নজরকাড়া ঘটনা হতে পারে। কারণ এটি শুধু একটি দলের নির্বাচনী কৌশল নয়। এটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক দল মাঠপর্যায়ে কতটা শক্ত, সেটি যাচাইয়ের পরীক্ষাও।