সর্বশেষ :
জীবননগরে আইসিটি কর্মকর্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ টানা পাঁচ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা, স্বস্তি মিলতে পারে তাপদাহ থেকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কঠোর নির্দেশনা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি না করার সতর্কবার্তা অবৈধ গ্যাস সংযোগে চুন কারখানা, রাষ্ট্রের কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগে দুইজন কারাগারে কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া হামলা হলে ন্যাটোকে বিধ্বংসী জবাব দেবে রাশিয়া লেবানন সীমান্তে সংঘর্ষে নিহত ৪ ইসরাইলি সেনা, বাড়ছে উত্তেজনা সাঘাটায় যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে শতাধিক পরিবার আড়াই ঘণ্টার পতাকা বৈঠকেও মিলল না ডিপজলের খোঁজ, উদ্বেগে পরিবার সাতক্ষীরায় পৃথক স্থান থেকে তিন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

দূষণের তালিকায় তৃতীয় ঢাকা, শীর্ষে জাকার্তা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
  • ৩৮ বার

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় আবারও ওপরের দিকে উঠে এসেছে ঢাকা। শুক্রবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের লাইভ র‍্যাংকিংয়ে ১৫৫ স্কোর নিয়ে ঢাকা ছিল তৃতীয় অবস্থানে। ওই সময় ঢাকার বাতাসকে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে ধরা হচ্ছিল। এতে শিশু, প্রবীণ, শ্বাসকষ্টের রোগী এবং হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি থাকে।

একই সময়ে দূষিত শহরের তালিকায় ১৮৪ স্কোর নিয়ে শীর্ষে ছিল ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। ১৫৯ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল চীনের রাজধানী বেইজিং। ঢাকার পর ১৫৩ স্কোর নিয়ে চতুর্থ স্থানে ছিল কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা। ১৪৭ স্কোর নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে ছিল উগান্ডার রাজধানী কামপালা।

ঢাকার বায়ুদূষণ এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়। বরং এটি বছরের বড় অংশজুড়ে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কখনো বৃষ্টি হলে বাতাসে ভাসমান ধুলা ও দূষণ কিছুটা কমে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আবার দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। বিশেষ করে যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, রাস্তার মাটি, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং ইটভাটার ধোঁয়া রাজধানীর বাতাসকে নিয়মিতভাবে দূষিত করছে।

আইকিউএয়ারের স্কোর শূন্য থেকে ৫০ হলে বায়ুমান ভালো ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ স্কোর মাঝারি। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর। ১৫১ থেকে ২০০ হলে তা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোর খুব অস্বাস্থ্যকর। আর ৩০১ থেকে ৪০০ স্কোর ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপজ্জনক পর্যায়ে পড়ে। শুক্রবার সকালে ঢাকার স্কোর ১৫৫ হওয়ায় শহরের বাতাস সাধারণ মানুষের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকির পর্যায়ে ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার দূষণের বড় উৎস হলো যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া। রাজধানীতে প্রতিদিন লাখো গাড়ি চলাচল করে। অনেক বাস, ট্রাক, লেগুনা ও পুরোনো যানবাহন ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। ফলে সেগুলো থেকে ক্ষতিকর ধোঁয়া বের হয়। এই ধোঁয়া বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণার সঙ্গে মিশে মানুষের ফুসফুসে ঢুকে পড়ে।

নির্মাণকাজও ঢাকার বাতাস নষ্ট করার আরেক বড় কারণ। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণ, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, মেট্রোরেল, ড্রেনেজ, সড়ক সংস্কার এবং বেসরকারি নির্মাণকাজ প্রায় সারা বছরই চলে। এসব জায়গায় ধুলা নিয়ন্ত্রণের নিয়ম থাকলেও তা অনেক সময় মানা হয় না। নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা হয় না। ট্রাকে বালু, মাটি বা সিমেন্ট পরিবহনের সময়ও ধুলা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বাতাসে দূষণ দ্রুত বাড়ে।

ঢাকার রাস্তার ধুলাও বড় সমস্যা। অনেক সড়কে নিয়মিত পানি ছিটানো হয় না। আবার কিছু এলাকায় রাস্তা ভাঙা বা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ধুলা বেশি উড়ে। বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের চাপে সেই ধুলা বাতাসে মিশে যায়। শুষ্ক মৌসুমে সমস্যা আরও ভয়াবহ হয়। বর্ষায় বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান আসে না।

শিল্পকারখানার নির্গমনও ঢাকার বায়ুমানে প্রভাব ফেলে। রাজধানীর আশপাশে অনেক কারখানা, ইটভাটা ও ছোট শিল্প এলাকা রয়েছে। এসব জায়গায় জ্বালানি ব্যবহারের ধরন, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পরিবেশ আইন মানার ওপর দূষণের মাত্রা নির্ভর করে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, দূষণ কমাতে শুধু ঢাকার ভেতরের উৎস নয়, আশপাশের শিল্পাঞ্চলও নজরদারিতে আনতে হবে।

দূষিত বাতাসের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশুদের ওপর। শিশুদের ফুসফুস এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। তাই দূষিত বাতাস তাদের শ্বাসতন্ত্রে দ্রুত প্রভাব ফেলে। কাশি, হাঁপানি, অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট এবং ফুসফুসের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। স্কুলগামী শিশুদের জন্য সকালবেলার দূষিত বাতাস বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ এ সময় অনেক শিশু বাইরে থাকে।

প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের ঝুঁকিও বেশি। যাদের হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ফুসফুসের পুরোনো সমস্যা আছে, তাদের জন্য এমন বায়ুমান বিপজ্জনক হতে পারে। AQI ১৫১ ছাড়ালে তাদের বাইরে দীর্ঘ সময় থাকা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার করা, ধুলাবালি এড়ানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

ঢাকার বায়ুদূষণ শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি অর্থনৈতিক সমস্যাও। দূষণের কারণে মানুষ অসুস্থ হয়। চিকিৎসা খরচ বাড়ে। কর্মক্ষমতা কমে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া ব্যাহত হয়। শ্রমজীবী মানুষের কাজের ওপর প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে দূষণ দেশের উৎপাদনশীলতাও কমাতে পারে। তাই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণকে শুধু পরিবেশ ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের মতো ঢাকাও দ্রুত নগরায়ণের চাপ সামলাচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নির্মাণ, দুর্বল গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ, জলাশয় ভরাট, সবুজ এলাকা কমে যাওয়া এবং আইন প্রয়োগের ঘাটতি দূষণকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে সাময়িক বৃষ্টি বা হাওয়া বদল দূষণ কিছুটা কমালেও মূল সমস্যা থেকে যায়।

আইকিউএয়ারের লাইভ র‍্যাংকিং সময়ের সঙ্গে বদলায়। সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা বা রাতভেদে স্কোর ওঠানামা করে। বাতাসের দিক, বৃষ্টি, আর্দ্রতা, যানবাহনের চাপ, শিল্পকারখানার কার্যক্রম এবং স্থানীয় উৎসের কারণে AQI দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের র‍্যাংকিং পুরো দিনের স্থায়ী চিত্র নয়। তবে বারবার শীর্ষ তালিকায় ঢাকার নাম উঠে আসা বড় সতর্কবার্তা।

এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকদেরও কিছু সতর্কতা দরকার। বাইরে গেলে ভালো মানের মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশু ও প্রবীণদের অপ্রয়োজনে বাইরে না রাখা ভালো। খোলা জায়গায় ব্যায়াম করার সময় বায়ুমান দেখে নেওয়া উচিত। ঘরের ভেতরে ধুলা কমাতে জানালা বন্ধ রাখা, নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশ বজায় রাখাও জরুরি।

তবে ব্যক্তিগত সতর্কতা দিয়ে বায়ুদূষণ সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার নীতি ও বাস্তব কাজ। পুরোনো ও ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। রাস্তা নিয়মিত পরিষ্কার ও পানি ছিটানোর ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণে নজরদারি শক্ত করতে হবে। ইটভাটা ও বর্জ্য পোড়ানোর ওপরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ দরকার।

ঢাকার বায়ু ভালো করা সম্ভব। কিন্তু তা করতে হলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্ত আইন প্রয়োগ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়। সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, রাজউক, পুলিশ, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আজকের র‍্যাংকিং আবারও দেখাল, ঢাকা এখনো দূষণের চাপে আছে। জাকার্তা শীর্ষে থাকলেও ঢাকার অবস্থানও উদ্বেগজনক। ১৫৫ স্কোর কোনো সাধারণ সতর্কতা নয়। এটি শহরের বাতাসে স্বাস্থ্যঝুঁকির স্পষ্ট বার্তা। তাই এখন প্রশ্ন শুধু “ঢাকার খবর কী” নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এই শহরের বাতাস কবে নিরাপদ হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত