সর্বশেষ :
জীবননগরে আইসিটি কর্মকর্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ টানা পাঁচ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা, স্বস্তি মিলতে পারে তাপদাহ থেকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কঠোর নির্দেশনা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি না করার সতর্কবার্তা অবৈধ গ্যাস সংযোগে চুন কারখানা, রাষ্ট্রের কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগে দুইজন কারাগারে কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া হামলা হলে ন্যাটোকে বিধ্বংসী জবাব দেবে রাশিয়া লেবানন সীমান্তে সংঘর্ষে নিহত ৪ ইসরাইলি সেনা, বাড়ছে উত্তেজনা সাঘাটায় যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে শতাধিক পরিবার আড়াই ঘণ্টার পতাকা বৈঠকেও মিলল না ডিপজলের খোঁজ, উদ্বেগে পরিবার সাতক্ষীরায় পৃথক স্থান থেকে তিন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বৈশ্বিক পদক্ষেপ চান শামা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
  • ৩২ বার

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সমুন্নত রাখা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ইকোসক হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স সেগমেন্টের উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় তিনি এ আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, সহিংসতা ও মানবিক সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নারী, শিশু, কিশোরী, প্রবীণ ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। তাই বেসামরিক মানুষের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

তিনি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তার মতে, আইন ভঙ্গের পরও যদি দায়মুক্তি থাকে, তাহলে সংঘাত আরও দীর্ঘ হয়। নিরীহ মানুষের কষ্টও বাড়ে। তাই মানবিক আইনের প্রতি সম্মান শুধু নীতিগত বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর বাস্তব শর্ত।

শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, সংঘাত শুরু হওয়ার পর শুধু ত্রাণ সহায়তা দিয়ে সংকট সামলানো যথেষ্ট নয়। বরং সংঘাত প্রতিরোধে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। এই তিনটি ক্ষেত্র আলাদা করে দেখলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন।

তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা বহু বছর ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা দরকার।

বাংলাদেশ বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই সংকট চলতে থাকায় মানবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ বাড়ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। তাই বাংলাদেশ বারবার বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা শুধু বাংলাদেশের নয়। এটি আন্তর্জাতিক সংকট। এর সমাধানও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই হতে হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের ওপর চলমান অর্থায়ন সংকটের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও গভীর উদ্বেগ জানান। তিনি বলেন, মানবিক সহায়তার ঘাটতি সবচেয়ে আগে আঘাত করে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা ও মানসিক সহায়তার ঘাটতি নারী ও শিশুদের আরও অনিরাপদ করে তোলে। বিশেষ করে কিশোরীদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া, শিশুবিয়ে, পাচার, নির্যাতন ও শোষণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তিনি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি রোহিঙ্গা সহায়তা কার্যক্রমে অর্থায়ন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, প্রত্যাবাসনই চূড়ান্ত লক্ষ্য। তবে সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মৌলিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা কমানো যাবে না। এতে শুধু মানবিক বিপর্যয় বাড়বে না, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

শামা ওবায়েদ ইসলাম নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি ও অপব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এখন অনেক সময় সহিংসতা, ভয় দেখানো, চরিত্রহনন, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং যৌন হয়রানির জায়গা হয়ে উঠছে। সংঘাতপূর্ণ বা বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর নারী ও কিশোরীরা এই ঝুঁকির মুখে আরও বেশি অসহায়।

তিনি এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের আহ্বান জানান। তার মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সহিংসতা ও হয়রানি সীমান্ত মানে না। তাই এর প্রতিকারও এক দেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। দরকার তথ্য বিনিময়, নীতিগত সমন্বয়, প্রযুক্তি কোম্পানির জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তার আন্তর্জাতিক কাঠামো।

জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন। বাংলাদেশ মানবিক সহায়তায় বিশ্বাস করে। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশ মনে করে, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াই সংকটের মূল সমাধান।

রোহিঙ্গা সংকট এখন আট বছরের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনে বাস্তব অগ্রগতি খুব সীমিত। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিকত্ব প্রশ্ন এবং রাখাইন রাজ্যের অস্থিরতা প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ চাইছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ বাড়াক। শুধু বিবৃতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে মানবিক আইনের জবাবদিহির প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বজুড়ে সংঘাতে হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র, খাদ্য সরবরাহ এবং বেসামরিক অবকাঠামো হামলার শিকার হচ্ছে। এতে যুদ্ধক্ষেত্র ও সাধারণ মানুষের জীবনের সীমারেখা মুছে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইনকে কার্যকর করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, মানবিক সংকটে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু জরুরি খাদ্য বা ওষুধ দিলেই চলবে না। মানুষের নিরাপত্তা, শিক্ষা, জীবিকা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতের পথও ভাবতে হবে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকটে শিশু ও তরুণদের হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।

অনুষ্ঠানের ফাঁকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভিয়েতনামের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. নগুয়েন মিন ভুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক অঙ্গনে সহযোগিতা জোরদারের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম উভয়ই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাণিজ্য, শিক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ দেখছে।

এই সফর ও বক্তব্য বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন যুদ্ধ ও মানবিক সংকট তৈরি হওয়ায় রোহিঙ্গা ইস্যু অনেক সময় আলোচনার বাইরে চলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি এখনো প্রতিদিনের বাস্তবতা। তাই জাতিসংঘের মঞ্চে বিষয়টি তুলে ধরা জরুরি ছিল।

বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার। রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন ক্যাম্পে আটকে রাখা যাবে না। তাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরতে হবে। সেই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের আগে ও পরে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু সহায়তা নয়, রাজনৈতিক সমাধানেও ভূমিকা নিতে হবে।

সব মিলিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্য তিনটি বড় বার্তা দিয়েছে। প্রথমত, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, মানবিক আইন লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও কিশোরীদের জীবন এখনো অনিশ্চয়তার ভেতর। তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, খাদ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের আহ্বান শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি একটি মানবিক সতর্কবার্তা। বিশ্ব যদি সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত