রাজধানীর কদমতলী এলাকায় মাদক ব্যবসার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে এক সবজি ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত ব্যক্তির পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা মাদক কারবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত আব্দুল কুদ্দুস (৫০) পেশায় একজন সবজি ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি রাজধানীর পূর্ব জুরাইন এলাকায় পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায়। দুই কন্যা সন্তানের জনক কুদ্দুস স্থানীয়ভাবে একজন শান্ত ও প্রতিবাদী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে জুরাইন নবারুন গলির একটি চায়ের দোকানের সামনে কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন আব্দুল কুদ্দুস। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন যুবক সেখানে এসে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। একপর্যায়ে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। তবে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এলাকার কয়েকজন কথিত মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতেন আব্দুল কুদ্দুস। সম্প্রতি স্থানীয় একটি দোকানকে কেন্দ্র করে মাদক বিক্রির বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কয়েকজনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে তাদের দাবি।
নিহতের মা রানু বেগম বলেন, তার ছেলে এলাকার তরুণদের মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে সচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা করতেন। মাদক বিক্রির বিষয়টি নিয়ে তিনি একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছিলেন। এর কারণে কিছু ব্যক্তির সঙ্গে তার মনোমালিন্য তৈরি হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন আগে একই বিষয় নিয়ে আব্দুল কুদ্দুসের সঙ্গে কয়েকজনের বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। এরপর থেকেই তিনি এক ধরনের চাপের মধ্যে ছিলেন। তবে বিষয়টি এত ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাবে, তা কেউ কল্পনা করেননি।
এলাকার বাড়িওয়ালা ও ব্যবসায়ী কামাল শিকদার জানান, মাদক বিক্রিকে কেন্দ্র করে পূর্ব থেকেই বিরোধ চলছিল। আব্দুল কুদ্দুস প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করতেন। তার মতে, ঘটনার পেছনে সেই বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ কথা বলতে ভয় পায়। যারা প্রতিবাদ করেন, তাদের নানা ধরনের হুমকি ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। তাই এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং দায়ীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। হত্যার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কদমতলী থানার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পূর্ব বিরোধ এবং মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করতে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে সংঘটিত সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদকের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্যই নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
এদিকে আব্দুল কুদ্দুসের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনরা বলছেন, একজন পরিশ্রমী মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন বলেই প্রাণ হারালেন। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদেরও একই প্রত্যাশা—যাতে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হয় এবং ভবিষ্যতে কেউ সমাজের অনিয়ম ও অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় না পায়।