পবিত্র হজ পালন শেষে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি হাজিদের দেশে ফেরার কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ইতোমধ্যে ৬০ হাজারের বেশি হাজি দেশে ফিরেছেন। ফিরতি ফ্লাইটের মাধ্যমে প্রতিদিনই দেশে আসছেন হাজারো হজযাত্রী, আর বিমানবন্দরগুলোতে স্বজনদের সঙ্গে তাদের আবেগঘন পুনর্মিলনের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৬০ হাজার ৫৮৮ জন বাংলাদেশি হাজি দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালনকারী ৪ হাজার ৩১৯ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫৬ হাজার ২৬৯ জন হাজি রয়েছেন।
হজ শেষে দেশে ফেরত আসা যাত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই সুস্থভাবে ফিরলেও এবারের হজ মৌসুমে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, হজ পালনকালে এবং হজ-পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবে এ পর্যন্ত ৫৪ জন বাংলাদেশি মৃত্যুবরণ করেছেন।
মৃতদের মধ্যে ৩৬ জন পুরুষ এবং ১৮ জন নারী। স্থানভেদে মৃত্যুর সংখ্যার হিসাবে মক্কায় সবচেয়ে বেশি ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মদিনায় ১৬ জন এবং জেদ্দায় একজন বাংলাদেশি হাজি মৃত্যুবরণ করেছেন। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী তাদের সৌদি আরবেই দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও হজ ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সৌদি আরবে স্থাপিত মেডিকেল সেন্টার ও স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটগুলো হজযাত্রীদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে বাংলাদেশি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ৬৬ হাজার ২৪৯টি স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন তথ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং জরুরি সেবার জন্য আইটি হেল্পডেস্কের মাধ্যমে ২৮ হাজার ১৯৮টি সেবা দেওয়া হয়েছে।
হজের মতো বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বয়স্ক হাজিদের জন্য চিকিৎসা সহায়তা, ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি সেবা কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ বছর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আগের বছরের তুলনায় আরও সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়েছে।
চলতি বছর পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হয় ২৬ মে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসল্লিদের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকেও বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব সফর করেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে যান। সব মিলিয়ে প্রায় ৭৮ হাজার ৫০০ জনের বেশি বাংলাদেশি হজ পালনের সুযোগ পান।
হজযাত্রীদের যাত্রা ও আবাসন ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে কাজ করেছে। বিভিন্ন হজ এজেন্সি এবং সরকারি কর্মকর্তারাও সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের মাধ্যমে হাজিদের সেবা প্রদান করেছেন।
এদিকে ৩০ মে থেকে বাংলাদেশি হাজিদের ফিরতি ফ্লাইট শুরু হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সৌদি এয়ারলাইন্স এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পরিবহন সংস্থার মাধ্যমে ধাপে ধাপে হজযাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ফিরতি ফ্লাইট কার্যক্রম চলবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট সব হাজিকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
হজ শেষে দেশে ফিরে অনেক হাজিই তাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন। তারা জানান, ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। অনেকেই হজযাত্রাকে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হজ শুধু একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের মতো বাংলাদেশ থেকেও হাজার হাজার মানুষ এই মহাসমাবেশে অংশ নিয়ে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অর্জনের চেষ্টা করেন।
সব মিলিয়ে, হজ মৌসুম শেষে বাংলাদেশি হাজিদের দেশে ফেরার কার্যক্রম এখন শেষ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অবশিষ্ট হাজিরাও নিরাপদে দেশে ফিরবেন এবং এবারের হজ ব্যবস্থাপনা সফলভাবে সম্পন্ন হবে।