প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে এক অনন্য ও নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা করলেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিতে তিনি আদালতে আইনজীবীদের ব্যবহৃত বিশেষ ব্যান্ড পরিহিত অবস্থায় সংসদে প্রবেশ করেন। তার এই পোশাক সংসদীয় অঙ্গনে তো বটেই, পুরো রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আলোচনার শুরুতেই তিনি নিজের পোশাকের প্রতি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একজন আইনজীবী ও আইনের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি যে এই বিশেষ পোশাকের বিধিবদ্ধ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সম্যক অবগত, তা তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন। তবে কেন এই বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি এই ব্যান্ড পরে সংসদে এসেছেন, সেই অন্তর্নিহিত কারণটি তিনি স্পিকারের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। রুমিন ফারহানার এই প্রতীকী অবস্থান দেশের বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর এক গভীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষক মহল।
বক্তব্যের মূলভাগে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক দশা নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকার বরাদ্দকে অযৌক্তিক দাবি করে মন্ত্রণালয়ের কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল—এই মাত্র দুই মাসে দেশে রেকর্ড সংখ্যক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এই দুই মাসে সারা দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি। অপরাধের এই বিশাল খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে দেশের সাধারণ মানুষ। কেবল হত্যাকাণ্ড নয়, একই সময়ে ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ, ২২১৪টি চুরি এবং ১২৯টি পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনায় সরকারের ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি মামলা এই পরিসংখ্যানকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
রুমিন ফারহানার ছাঁটাই প্রস্তাবের যৌক্তিকতায় বলা হয়েছে, যে মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতায় প্রতিদিন এতো মানুষ প্রাণ হারায়, সেই মন্ত্রণালয়ের জন্য বিপুল পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া কতটা সমীচীন? তিনি তার বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের বাচনভঙ্গি ও ডিবেট করার ক্ষমতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা শুনতে তিনি মুগ্ধ হন, কিন্তু সেই মুগ্ধতা যদি মন্ত্রণালয়ের কাজের ফলাফলের সঙ্গে মিলত, তবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না। তার এই সমালোচনা ছিল মূলত একটি কাঠামোগত প্রশ্ন—কেবল সুবচন দিয়ে কি জননিরাপত্তা রক্ষা সম্ভব? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা ও অপরাধীদের ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্য নিয়ে তিনি যেভাবে সংসদের ফ্লোরে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন, তা সংসদীয় বিতর্কের ইতিহাসে একটি শক্তিশালী অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংসদে তার এই পোশাক নিয়ে যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়, তার জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ সংসদীয় রীতিনীতি ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি বা রুলস অব প্রসিডিউর হলো এই হাউসের পরিচালনার মূল ভিত্তি। এখানে বাইরের কোনো আদালতের বিধি-বিধান বা আইন কার্যকর হয় না। সংবিধান নিজেই এই সার্বভৌম সংসদকে নিজের বিধি তৈরির পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রুমিন ফারহানার পোশাকটিকে অত্যন্ত ‘শোভন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সংসদে নিজের পছন্দমতো পোশাক পরিধানের পূর্ণ স্বাধীনতা একজন সংসদ সদস্যের রয়েছে। তিনি জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের মতামতের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে হাস্যরসের অবতারণা করে বলেন, আইনজীবীদের ভাষায় ‘শি ইনক্লুডস হি’, অর্থাৎ এখানে পোশাক নিয়ে কোনো ধরনের সংকীর্ণ বিধিনিষেধ নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মাধ্যমে পোশাক কেন্দ্রিক বিতর্কের আপাত সমাপ্তি ঘটলেও, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা যে মূল বার্তাটি দিতে চেয়েছিলেন, তা আলোচনার টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ হয়েই রইল। সংসদের ভেতরে বাইরের আদালতের পোশাক পরে আসার মাধ্যমে তিনি সম্ভবত দেশের আইনি কাঠামোর অকার্যকারিতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীকের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের সংকটকেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। তার এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, একজন জনপ্রতিনিধি তার পোশাকের মাধ্যমেও একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন। জাতীয় সংসদ যখন মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু, তখন সেখানে এমন প্রতীকী প্রতিবাদ দেশের চলমান সংকটের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতাকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, রুমিন ফারহানার পোশাক কেন্দ্রিক এই বিতর্ক কেবল ফ্যাশন বা সংসদীয় রীতির বিষয় ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে পোশাকের স্বাধীনতাকে সমর্থন জানালেও, রুমিন ফারহানার মূল দাবি—নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মন্ত্রণালয়গুলোর কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি—সেটি এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের সাধারণ মানুষ আশা করে, ছাঁটাই প্রস্তাব বা বাজেট নিয়ে কেবল কথার লড়াই হবে না, বরং বাস্তব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই প্রত্যাশা করে যে, সংসদীয় বিতর্কে যে ভিন্নমতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তা দেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে। রুমিন ফারহানার এই সরব উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ এখনো উন্মুক্ত, যা সুস্থ রাজনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।