হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণে ফ্রান্সের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
  • ২০ বার
হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণে ফ্রান্সের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তবে এবার যুদ্ধের দামামা নয়, বরং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ইরান এবং ফ্রান্স। সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিরাপদ করার নামে ফ্রান্স যে মাইন অপসারণের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল, তা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং সেখানে মাইন অপসারণের পূর্ণ অধিকার একমাত্র ইরানের। যেকোনো বিদেশি শক্তি বা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপকে ইরান তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে এবং এই বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সম্প্রতি ওমানের সাথে সমন্বয় করে এবং মিত্র দেশগুলোর সহায়তায় হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণের যে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, তার প্রতিক্রিয়ায় ইরান এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ম্যাখোঁর দাবি ছিল, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং এই নৌপথকে নিরাপদ রাখতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু ইরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক কাজেম গারিবাবাদি ফরাসি প্রেসিডেন্টকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, গত ১৭ জুলাই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেই চুক্তির শর্তানুযায়ী হরমুজ প্রণালীর মাইন অপসারণের দায়িত্ব কেবল ইরানের ওপর ন্যস্ত। চুক্তির এই শর্ত লঙ্ঘন করে কোনো দেশেরই এখানে প্রবেশাধিকার নেই।

ইরান কেন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল, তার পেছনে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। তেহরান মনে করে, হরমুজ প্রণালী তাদের ভৌগোলিক সীমানার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অর্থ হলো জাতীয় নিরাপত্তার বড় ধরনের ঝুঁকি। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী গারিবাবাদি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, বর্তমানের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল পরিস্থিতিতে অন্য কোনো দেশের উসকানিমূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলবে। ইরানের ভাষায়, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে পরামর্শ দিচ্ছি, এমন কোনো কাজ করবেন না যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।’ অর্থাৎ ইরান ফ্রান্সের প্রস্তাবকে কেবল একটি মানবিক সহায়তার প্রস্তাব হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে একটি সামরিক আধিপত্য বিস্তারের কৌশল হিসেবেই দেখছে।

হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন। সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে যেকোনো ছোট দুর্ঘটনা বা উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই প্রণালীতে বিধিনিষেধ আরোপ করায় বিশ্বজুড়ে যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল, তার প্রশমনেই পাকিস্তান এই মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে। ১৪ দফা সমঝোতা অনুযায়ী সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য টোলমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ইরান এখন সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ, তবে সেই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি হবে তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে।

ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, হরমুজ প্রণালী কখনোই যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সেই পুরনো অবস্থায় ফিরে যাবে না। দেশটি স্পষ্ট করেছে, এই জলপথের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার আগের চেয়েও বেশি এখন সংহত। ইরানের এই অবস্থানের পেছনে মূল কারণ হলো তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি শক্তির উপস্থিতিকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সাথে সামরিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর ইরান এখন এই অঞ্চলকে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। তারা বিশ্বাস করে, মাইন অপসারণের মতো সূক্ষ্ম সামরিক কাজ যদি বিদেশি কোনো দেশের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে ইরানকে আরও বড় ধরনের চাপে ফেলার সুযোগ তৈরি হবে।

ফ্রান্সের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে একটি বার্তাই দিচ্ছে—তারা এখন আর আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। পাকিস্তানের মাধ্যমে হওয়া ওই সমঝোতা স্মারকটি ইরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি আলোচনার একটি পথ তৈরি হয়েছে, যা আগে অসম্ভব ছিল। এখন ইরান চায় সেই সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী তাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু এই শান্তির প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো ইউরোপীয় বা পশ্চিমা শক্তির অংশগ্রহণ ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক এই নতুন উত্তেজনার ফলে আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে ফ্রান্স তার মৈত্রীর খাতিরে এই অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে ইরান তার নিজস্ব ভূখণ্ডে বিদেশি উপস্থিতি ঠেকাতে মরিয়া। বিশ্ববাসী এখন এই সংকটের সমাধানের দিকে তাকিয়ে আছে। যদি ইরান নিজেই সব কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তবে তা বিশ্ববাজারের জন্য আশীর্বাদ হবে। কিন্তু যদি ফ্রান্স বা অন্য কোনো দেশ ইরানের আপত্তি উপেক্ষা করে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে, তবে হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি এড়ানো কঠিন হবে। ইরান তাদের এই অবস্থান থেকে নড়বে না—এটাই এখনকার বাস্তবতা।

পরিশেষে বলা যায়, পারস্য উপসাগরের এই জলপথটি আজ বিশ্ব রাজনীতির দাবা খেলার মূল বোর্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান যখন মাইন অপসারণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে, তখন তা তাদের জন্য নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের একটি সুযোগও বটে। তবে এই দায়িত্ব পালনে ইরান কতটা সফল হয় এবং তাদের কাজের ফলে বিশ্ববাজার কতটা আশ্বস্ত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। একটি বাংলাদেশ অনলাইনের পক্ষ থেকে আমরা বিশ্বাস করি, যুদ্ধের চেয়ে শান্তিই এই অঞ্চলের জন্য শ্রেয়। সব পক্ষ যদি সমঝোতা স্মারকের প্রতি সম্মান জানায় এবং ইরানকে তার কাজ করার সুযোগ দেয়, তবেই হয়তো এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। অন্যথায়, হরমুজ প্রণালী কেবল পানির স্রোত নয়, বরং অস্থিরতার এক চিরস্থায়ী উৎস হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত