তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির পথে কোয়েল, রাজনৈতিক জল্পনা তুঙ্গে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৭৬ বার
তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির পথে কোয়েল, রাজনৈতিক জল্পনা তুঙ্গে

প্রকাশ:  ১৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফের এক বড়সড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে ভাঙনের সুর বেজে উঠেছিল, তা যেন এখন এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তৃণমূলের একাধিক প্রথম সারির নেতা ও সাংসদদের দলবদলের এই মিছিলে এবার যোগ দিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও রাজ্যসভার সাংসদ কোয়েল মল্লিক। রাজনীতির করিডোরে এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে দিল্লিতে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাকৃষ্ণণের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমেই তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক ইতি টানলেন। আর তার এই নাটকীয় পদত্যাগের ঠিক পরেই বিজেপি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে তার বৈঠক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

কোয়েল মল্লিকের এই পদত্যাগ কেবল একটি দলীয় ইস্তফা নয়, বরং তৃণমূলের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতির এক জলন্ত দলিল। অভিনেত্রী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের টিকিটে রাজ্যসভার সাংসদ হওয়ার পর থেকেই তাকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সাংসদ হওয়ার পর থেকে সংসদের বিভিন্ন অধিবেশনে তার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে তার উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল, যা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। কিন্তু সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার আগেই তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেন। পদত্যাগপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই তিনি সরাসরি সোজা চলে গেলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে।

ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে কোয়েলের এই সাক্ষাৎ কেবল সৌজন্যমূলক নয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। কারণ গত কয়েকদিন ধরে এই মন্ত্রীর দিল্লির বাসভবনটি তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। এর আগে তৃণমূলের ২০ জন লোকসভা সাংসদ এই মন্ত্রী এবং বিজেপির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই-তে যোগ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তৃণমূলের প্রবীণ ও পরিচিত মুখ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের মতো নেতারাও তৃণমূলের মায়া কাটিয়ে বিজেপির পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন। বিজেপিতে যোগদানের পরপরই এই নেতাদের পুনরায় রাজ্যসভায় মনোনয়ন দিয়ে পাঠিয়ে গেরুয়া শিবির নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কোয়েল মল্লিকের বিজেপি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক অনেকটা আগাম সংকেত দিচ্ছে যে, তিনি খুব শীঘ্রই বিজেপির শিবিরের অংশ হতে চলেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তৃণমূলের এই বিদ্রোহের পেছনে একটি সুপরিকল্পিত সমন্বয় কাজ করছে। বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী তৃণমূলের অন্দরে এক প্রকার সমান্তরাল রাজনীতির বাতাবরণ তৈরি করেছিল। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে তৃণমূলের ২০ সাংসদের এনসিপিআইতে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করার পেছনেও রয়েছে একই কৌশলী পরিকল্পনা। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কোয়েল মল্লিকের এই পদত্যাগ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে তার সাক্ষাত সেই কৌশলেরই অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি নিয়ে কোয়েল মল্লিক সরাসরি মুখ না খুললেও, তার এই পদক্ষেপ তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে আরও একবার প্রকাশ্যে নিয়ে এল।

তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এটি কেবল একটি বড় ধাক্কা নয়, বরং তাদের জনপ্রিয়তার ভিতে বড় ধরনের ফাটল। বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল যখন নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একের পর এক তারকা ও প্রভাবশালী নেতাদের দলত্যাগ তাদের মনোবলকে চূর্ণ করছে। তৃণমূলের মতো একটি সংগঠিত দলে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলা নতুন নয়, তবে বর্ষীয়ান ও তরুণ প্রজন্মের নেতাদের সম্মিলিত প্রস্থান দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করছে। তৃণমূলের অন্দরমহল বলছে, দলের ভেতরকার ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর অনাস্থাই এই ধারাবাহিক দলত্যাগের মূল কারণ। একদিকে বিজেপির আগ্রাসী রাজনীতি এবং অন্যদিকে এনসিপিআইয়ের মতো নতুন মঞ্চে যোগদানের হিড়িক তৃণমূলের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে।

কোয়েল মল্লিকের এই সিদ্ধান্তের পর প্রশ্ন উঠছে, অভিনেত্রী কি কেবল সাংসদ পদ ত্যাগ করেই ক্ষান্ত হবেন, নাকি খুব দ্রুত গেরুয়া শিবিরের হয়ে রাজ্যসভার অলিন্দে দেখা যাবে তাকে? সুখেন্দুশেখর রায় বা সুস্মিতা দেবদের মতো তাকেও বিজেপি নতুন করে সুযোগ দেয় কি না, তা নিয়ে সরগরম রাজনৈতিক অলিন্দ। তবে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এই উত্তাল সময়ে তার এই সরে যাওয়া তৃণমূলের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির সংকেত দিচ্ছে। একটি পরিবারের মতো থাকা দল আজ টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের লড়াই ও পরিকল্পনার ওপরও একটি বড় আঘাত। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন কেবল দল বদল নয়, বরং আদর্শগত পরিবর্তনের এক বিশাল অধ্যায় রচিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি ঘটনা নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।

শেষ পর্যন্ত কোয়েল মল্লিকের রাজনৈতিক যাত্রা কোন পথে বাঁক নেবে, তা সময়ের গর্ভেই নিহিত। তবে তার এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে রাজ্যের রাজনীতির মূল স্রোতকে প্রভাবিত করবে। রাজনীতিতে অভিনয়ের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হয়েছেন, তা পশ্চিমবঙ্গের আমজনতার নজর কেড়েছে। তৃণমূলের প্রতি ক্ষোভ নাকি বিজেপির নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি তাকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল, তা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও নতুন তথ্য সামনে আসবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি পরিষ্কার যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাব ও আধিপত্য এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে, আর এই চ্যালেঞ্জ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজ্যের শাসক দল। একটি সম্পর্কের ভাঙন যেমন একটি সংসারের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়, তেমনি রাজনীতির এই বড় আকারের দলবদল পশ্চিমবঙ্গকে কোন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com