জবিতে সেমিনার ঘিরে ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৬ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি সেমিনারকে কেন্দ্র করে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ছাত্রদল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, উত্তেজনা ও পরবর্তী সময়ে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত এই অনুষ্ঠান ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের একাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তন এবং পরবর্তীতে শহীদ মিনার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করেই প্রথমে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। পরে অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার সময় সেই উত্তেজনা প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন। অনুষ্ঠানটি ঘিরে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের অবস্থানের কারণে শুরু থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে জকসুর কয়েকজন নেতা-কর্মী এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। প্ল্যাকার্ডে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা, শিক্ষার্থীদের জন্য অস্থায়ী আবাসিক হল নির্মাণ, মেডিকেল সেন্টারে আধুনিক ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানের দাবি তুলে ধরা হয়। এসব দাবি ইউজিসি চেয়ারম্যানের দৃষ্টিগোচর করার উদ্দেশ্যেই তাঁরা সেমিনারে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন বলে জানা যায়।

এ সময় মিলনায়তনের প্রবেশমুখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে জকসুর প্রতিনিধি ও জাতীয় ছাত্রশক্তির কর্মীদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জকসুর নেতা-কর্মীরা মিলনায়তনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে ইনকিলাব মঞ্চের কয়েকজন সদস্যকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

সেমিনার চলাকালে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদ মিনারের সামনে উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবারও তর্কাতর্কি শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তা হাতাহাতি ও মারামারিতে রূপ নেয়। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও নিরাপত্তাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে কিছু সময়ের জন্য ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে রয়েছেন জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ, কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুল্লাহ আল ফারুক, জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, তাঁদের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী সংঘর্ষে আহত হয়েছেন। তবে কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আহতদের নির্দিষ্ট সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।

ঘটনার পর জকসুর সহসভাপতি (ভিপি) রিয়াজুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও অবস্থান কর্মসূচির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি উপস্থাপনের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া অভিযোগ করেন, সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। তাঁর দাবি, জকসু ও ছাত্রশক্তির একাধিক নেতাকে মারধর করা হয়েছে এবং এতে কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল ভিন্ন দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইউজিসি চেয়ারম্যানের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং অনুষ্ঠানকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে কিছু সংগঠনের নেতা-কর্মী পরিকল্পিতভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের শান্তিপূর্ণভাবে সরে যেতে অনুরোধ করা হলেও তাঁরা তা মানেননি। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে মারামারির ঘটনা ঘটে। তিনি দাবি করেন, সংঘর্ষে ছাত্রদলেরও অনেক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সক্রিয়তা বেড়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ, আবাসন সংকট এবং শিক্ষাসেবার মানোন্নয়ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। এসব দাবি নিয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের দাবি উপস্থাপন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মতপার্থক্য থাকলেও তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা শুধু শিক্ষার পরিবেশকেই ব্যাহত করে না, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংঘর্ষের কারণ, দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এবং ঘটনার সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ঘটনার পর ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাতে নতুন করে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত