ইরান যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমছে যুক্তরাষ্ট্রের

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার

প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের বিরুদ্ধে টানা পাঁচ মাস ধরে চলমান সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অত্যাধুনিক নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এ কারণে মার্কিন সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে মার্কিন সেনাবাহিনীর স্থল থেকে স্থলে নিক্ষেপযোগ্য দুটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা—আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (ATACMS) এবং নতুন প্রজন্মের প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (PrSM)—ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের বড় অংশ ইতোমধ্যেই ব্যবহৃত হয়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে ঠিক কত পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কিংবা বর্তমানে কত অস্ত্র অবশিষ্ট রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি। সামরিক মজুতের পরিমাণকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এ ধরনের তথ্য সাধারণত গোপন রাখা হয়।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ATACMS দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সেনাবাহিনীর অন্যতম কার্যকর দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি নিরাপদ দূরত্ব থেকে শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, বিমানঘাঁটি, অস্ত্রভান্ডার কিংবা কমান্ড সেন্টারে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। ইউক্রেন যুদ্ধেও এই ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অন্যদিকে PrSM হচ্ছে এর আধুনিক সংস্করণ, যার পাল্লা, নির্ভুলতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও উন্নত।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি উন্নতমানের এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যয় হয় ১০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু সামরিক কৌশল নয়, অর্থনৈতিক ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল সংঘাতটি স্বল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু কয়েক মাস ধরে সংঘাত অব্যাহত থাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। ফলে এখন যুদ্ধের পাশাপাশি অস্ত্র মজুত ধরে রাখার সক্ষমতাও মার্কিন প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের হাতে থাকা স্থলভিত্তিক নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ ব্যবহার করেছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে নতুন অস্ত্র এনে সেই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে অস্ত্র মজুত কমে যাওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউস প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে ট্রাম্প দাবি করেন, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার অনেক বড় এবং প্রয়োজনের তুলনায়ও বেশি অস্ত্র দেশটির হাতে রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত এবং সামরিক শক্তির দিক থেকে এখনও বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি হওয়ার অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট শ্রেণির অস্ত্রের ঘাটতি তৈরি হতে পারে না। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার সংঘাত চললে অত্যাধুনিক নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কারণ এসব অস্ত্রের উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং নতুন করে সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী বিশ্বের যেকোনো স্থানে অভিযান পরিচালনার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র ও সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

তবে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, শুধু আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র নয়, প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করেছে। একই সময়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত THAAD ব্যবস্থার মজুতও যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্যাট্রিয়ট ও THAAD উভয় ব্যবস্থাই শত্রুপক্ষের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম। তাই এসব প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুত কমে গেলে ভবিষ্যতের যেকোনো বড় সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হতে পারে।

সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র চালকবাহী যুদ্ধবিমান দিয়ে সরাসরি বোমা হামলার পরিবর্তে দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর ফলে পাইলটদের ঝুঁকি কমলেও ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে এমন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই ধরনের অস্ত্রকে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এদিকে প্রতিরক্ষা শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান উৎপাদনের গতি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন, পরীক্ষা এবং সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং ভবিষ্যতে চীন, রাশিয়া বা অন্য কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির সঙ্গেও বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। তাই অস্ত্র মজুত পুনর্গঠন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন ওয়াশিংটনের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে উঠতে পারে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার দাবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এসব দাবির সবকিছু আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তবে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে উন্নত অস্ত্রের ব্যবহার, উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর যে চাপ আরও বাড়বে, সে বিষয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত