টিস্যু কালচারে রোগমুক্ত চারা, কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের কৃষি খাত ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগমুক্ত ও উন্নতমানের চারা উৎপাদন। একসময় বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো যেসব উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের চারা, এখন সেগুলোই দেশের গবেষণাগার ও হর্টিকালচার কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত হচ্ছে। এর ফলে কৃষক যেমন তুলনামূলক কম দামে উন্নতমানের চারা পাচ্ছেন, তেমনি দেশীয় কৃষি উৎপাদনও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

কাচের একটি ছোট বোতলের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র সবুজ উদ্ভিদকে দেখে সাধারণ মানুষের কাছে এটি হয়তো গবেষণাগারের একটি পরীক্ষামাত্র মনে হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের হাতে সেই ক্ষুদ্র টিস্যুই কয়েক মাসের ব্যবধানে হাজার হাজার রোগমুক্ত চারায় পরিণত হয়। পরে এসব চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক ও উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছে গিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ফল, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের চাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, টিস্যু কালচার এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে একই মানের বিপুল সংখ্যক রোগমুক্ত চারা অল্প জায়গায় উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। উন্নত বিশ্বের কৃষিতে বহু বছর ধরে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার হলেও বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে।

বর্তমানে দেশে জি-৯ জাতের কলা, এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, পেঁপে, স্টেভিয়া, অর্কিড, লিলিয়াম, জারবেরা এবং বিভিন্ন শোভাবর্ধক উদ্ভিদের রোগমুক্ত চারা দেশীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে। আগে এসব চারা ভারত, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এখন দেশেই উৎপাদন হওয়ায় আমদানি ব্যয় কমছে, একই সঙ্গে কৃষকেরাও সহজে উন্নতমানের চারা সংগ্রহ করতে পারছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কৃষিকে অধিক লাভজনক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে হলে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদের মতে, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক কৃষিতে এই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই ধারায় এগোচ্ছে। তিনি মনে করেন, আধুনিক কৃষির বিকাশ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রোগমুক্ত চারা নিশ্চিত করতে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির বিকল্প নেই।

দেশের অন্যতম সফল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার ইতোমধ্যে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি দুই লাখেরও বেশি চারা বিক্রি করে সরকারের জন্য ৫২ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব অর্জন করেছে। শুধু ফলের চারা নয়, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের চারার উৎপাদনও বাড়ানো হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত লিলিয়াম ফুলের চারা দেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত সরবরাহ করা হচ্ছে।

মাদারীপুরের আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরিতে প্রবেশ করলে দেখা যায় সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কৃষিবিজ্ঞানীরা সাদা অ্যাপ্রন ও মাস্ক পরে কাজ করছেন। সারি সারি কাচের বোতলে সংরক্ষিত রয়েছে উদ্ভিদের ক্ষুদ্র টিস্যু। ল্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিবিদ মো. এনামুল ইসলাম জানান, প্রথমে নির্বাচিত মাতৃগাছ থেকে ক্ষুদ্র টিস্যু সংগ্রহ করা হয়। এরপর বিশেষ পুষ্টিমাধ্যমে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কয়েকটি ধাপে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে একটি মাত্র টিস্যু থেকেই হাজার হাজার চারা তৈরি হয়। পরে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এসব চারা মাঠে রোপণের উপযোগী করে কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির সুফলও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কৃষক আবদুল কাদের টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত জি-৯ জাতের কলার চারা দিয়ে দেড় বিঘা জমিতে বাগান করেছেন। তাঁর বাগানের প্রতিটি ছড়িতে ২৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত কলা ধরছে, যেখানে দেশীয় অনেক জাতের কলায় সাধারণত ১৩০ থেকে ১৬০টি কলা পাওয়া যায়। তিনি জানান, একটি চারার দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে হলেও ফলন এত বেশি যে বিনিয়োগের তুলনায় লাভ অনেক বেশি হচ্ছে। তাঁর সাফল্য দেখে আশপাশের অনেক কৃষকও এই জাতের কলা চাষে আগ্রহী হয়েছেন।

শুধু ফল নয়, ফুল চাষেও এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বগুড়ার উদ্যোক্তা মো. রেজওয়ানুল ইসলাম টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত জারবেরা ফুলের চারা ব্যবহার করে বাণিজ্যিক খামার গড়ে তুলেছেন। প্রায় দেড় হাজার গাছের এই খামার থেকে তিনি প্রতি সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় করছেন। তিনি জানান, আগে বিদেশি চারা আমদানি করতে প্রতি চারায় প্রায় ৬০ টাকা ব্যয় হতো। এখন দেশীয় চারা ৩৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ অনেক কমেছে এবং লাভের পরিমাণ বেড়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব চালু রয়েছে। পাশাপাশি দেশের আরও আটটি জেলায় নতুন ল্যাব নির্মাণের কাজ চলছে। প্রতিটি ল্যাব বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত চারা উৎপাদনে সক্ষম। সবগুলো ল্যাব পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে বছরে প্রায় এক কোটি রোগমুক্ত চারা উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর জানান, টিস্যু কালচার প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করা যায়। এতে বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা কমছে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে এবং কৃষির আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে নতুন জাতের ফল ও ফুলের চারা উদ্ভাবন এবং গবেষণার কাজও চলমান রয়েছে।

দেশজুড়ে হর্টিকালচার সেন্টারগুলোর কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ৭৬টি হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে মাদারীপুর সবচেয়ে বেশি চারা বিক্রি করে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের চারা, পাবনা কুল, দিনাজপুর লিচু, বরিশাল নারিকেল ও আমড়া এবং গাজীপুর বিভিন্ন ফল ও শোভাবর্ধক গাছের চারা বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব কেন্দ্র থেকে চারা বিক্রি করে সরকারের আয় হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি সংকুচিত হওয়া এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বর্তমান বাস্তবতায় টিস্যু কালচার প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারা ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বিদেশি চারার আমদানি কমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পও আরও শক্তিশালী হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের চলমান উদ্যোগ, গবেষণার বিস্তার, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নতমানের রোগমুক্ত চারা উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির এই অগ্রযাত্রা শুধু কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন করবে না, বরং দেশের কৃষি অর্থনীতিকেও আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত