মিশিগানে ফিলিস্তিনপন্থি প্রগতিশীল এল-সায়েদের ঐতিহাসিক জয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
মিশিগানে ফিলিস্তিনপন্থি প্রগতিশীল এল-সায়েদের ঐতিহাসিক জয়

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপশ্চিমাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও রাজনৈতিক রাজ্য হিসেবে পরিচিত মিশিগান অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টির অত্যন্ত জমজমাট ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট প্রাইমারি নির্বাচন। মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল এবং দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই নির্বাচনী লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন ফিলিস্তিন-পন্থি প্রগতিশীল তরুণ নেতা ও চিকিৎসক আবদুল এল-সাইয়েদ। দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রচারণার পর বুধবার প্রকাশিত প্রাথমিক নির্বাচনী ফলাফলে তিনি কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্সকে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে পেছনে ফেলে বিজয় নিশ্চিত করেন। মার্কিন মূলধারার রাজনীতিতে এই ফলাফলকে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সমীকরণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক অভাবনীয় বিজয় হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ভোটারদের একটি বিশাল অংশ প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে পরিবর্তনকামী একজন নেতাকে বেছে নেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে নানা সমীকরণ শুরু হয়েছে।

এনবিসি নিউজ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পরিবেশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, মিশিগানের এই ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে নজিরবিহীন অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল। পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় পঁয়ষট্টি মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যার একটি বিশাল অংশ ব্যয় করা হয়েছিল মূলত এল-সাইয়েদের বিজয়ের পথ রোধ করার জন্য। সর্বশেষ প্রাপ্ত ভোট গণনার তথ্যানুযায়ী, অর্ধেকের বেশি কেন্দ্র থেকে আসা ফলাফলে দেখা গেছে যে ভোটাররা প্রগতিশীল এই নেতার পক্ষেই নিজেদের রায় দিয়েছেন। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই আসরে হ্যালি স্টিভেন্সের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর এল-সাইয়েদ প্রয়োজনীয় ভোট সংগ্রহ করে শীর্ষস্থান অধিকার করেন। নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ আদর্শগত লড়াইয়ে এই ফলাফল একটি বড় ধরনের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আবদুল এল-সাইয়েদের এই ঐতিহাসিক বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ইসরাইলপন্থি লবিং গ্রুপ এবং বিশেষ করে আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাকের জন্য একটি বিরাট ধাক্কা। প্রতিপক্ষ প্রার্থী হ্যালি স্টিভেন্সকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে এবং ফিলিস্তিন-পন্থি স্পষ্টভাষী নেতা এল-সাইয়েদের বিজয় ঠেকাতে আইপ্যাক ও সংশ্লিষ্ট লবিং গ্রুপগুলো ত্রিশ মিলিয়নেরও বেশি ডলার বিনিয়োগ করেছিল। তা সত্ত্বেও গ্রাসরুট বা তৃণমূল পর্যায়ের ভোটারদের জোরালো সমর্থন এবং প্রগতিশীল জনসমর্থনের মুখে সেই কোটি কোটি ডলারের প্রচারণামূলক কৌশল শেষ পর্যন্ত টিকেনি। এই প্রাইমারি লড়াইয়ে স্টেট লেজিসলেটর ম্যালোরি ম্যাকমোরো পূর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ালেও নির্বাচনের এই মোড়ে এল-সাইয়েদের পক্ষে দৃশ্যমান সমর্থন তৈরি হয়। ফলে কর্পোরেট ও লবিস্টদের প্রভূত আর্থিক প্রভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাধারণ মানুষের অনুদানে চলা একটি প্রচারণা কীভাবে সফল হতে পারে, এই নির্বাচন তার এক অনন্য নজির স্থাপন করল।

নির্বাচনে নিজের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর ৪১ বছর বয়সী চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য নেতা আবদুল এল-সাইয়েদ ডেট্রয়েটে উপস্থিত তার উচ্ছ্বসিত হাজার হাজার সমর্থকের মুখোমুখি হন। জয়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে বিজয়ের এই আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি আগামী নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের জন্য তাদেরকে আরও অনেক বড় লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। আগামী দিনে তাকে সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে। মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মিশিগানের এই আসনটি অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই আসনটির দখল ধরে রাখা বা পুনরুদ্ধার করা দুই প্রধান দলের জন্যই মর্যাদার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমর্থকদের উদ্দেশে উদ্দীপনামূলক বক্তব্যে এল-সাইয়েদ সরাসরি তার পরবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বীকে উদ্দেশ করে বলেন যে তারা বিজয়ের লক্ষ্যেই সামনের দিনগুলোতে মাঠে নামবেন।

চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং গাজায় দীর্ঘায়িত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এল-সাইয়েদের এই জয় আরব আমেরিকান ও মুসলিম ভোটারদের পাশাপাশি প্রগতিশীল মহলে গভীর প্রভাব ফেলেছে। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়ার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ভোটারদের নজর কেড়েছিলেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির ঐতিহ্যগত মধ্যপন্থী ও ইসরায়েল-পন্থি নীতিমালার প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ থেকে সাধারণ মানুষ তার চারপাশে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই এল-সাইয়েদ অভিযোগ করে আসছিলেন যে বহিরাগত স্বার্থান্বেষী মহল ও বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চক্রান্ত চলছে। তবে মিশিগানের সচেতন জনতা সেই সমস্ত প্রলোভন ও নেতিবাচক প্রচারকে প্রত্যাখ্যান করে পরিবর্তন ও ন্যায়বিচারের পক্ষে নিজেদের রায় প্রদান করেছে।

প্রচারণার পুরো সময়জুড়ে আবদুল এল-সাইয়েদ গাজায় চলমান সংঘাতকে কঠোর ভাষায় তুলে ধরে মার্কিন বৈদেশিক নীতির পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন যে ইসরায়েলকে নির্বিচারে প্রদান করা কোটি কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। এর পরিবর্তে সেই বিশাল অর্থ আমেরিকার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ জনকল্যাণমূলক খাত যেমন উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, সুলভ আবাসন, মানসম্মত শিক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা দরকার। তার এই জনকল্যাণমুখী ও বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক বার্তা মিশিগানের সাধারণ শ্রমজীবী ও তরুণ ভোটারদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। বর্তমান প্রশাসনের নীতিমালার প্রতি একধরনের অনাস্থা ও ক্ষোভ থেকেই ভোটাররা বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্বের সন্ধানে মুখিয়ে ছিলেন, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে আজকের এই নির্বাচনী ফলাফলে। পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত