মেধা-সততায় পদোন্নতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৮ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নয়, পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, সততা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাই যেন সামরিক কর্মকর্তাদের পদোন্নতির প্রধান মানদণ্ড হয়—এমন নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের পদোন্নতির লক্ষ্যে গঠিত ‘নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ নির্দেশনা দেন।

রোববার (২৩ আগস্ট) ঢাকা সেনানিবাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নির্বাচনী পর্ষদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসও পর্ষদ উদ্বোধনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এই নির্বাচনী পর্ষদের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন, কমান্ডার ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদমর্যাদার যোগ্য কর্মকর্তারা পরবর্তী পদে উন্নীত হওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন। একইভাবে বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন, উইং কমান্ডার ও স্কোয়াড্রন লিডার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির বিষয়ও পর্ষদে পর্যালোচনা করা হবে।

সশস্ত্র বাহিনীর মতো একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি শুধু ব্যক্তিগত কর্মজীবনের অগ্রগতি নয়। এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, বাহিনীর সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও জড়িয়ে থাকে। সেই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী পর্ষদের সদস্যদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে থাকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।

তিনি কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, শৃঙ্খলার মান, সততা, বিশ্বস্ততা, আনুগত্য এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনের উপযুক্ততা বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বের উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে আসার ওপর সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর দায়িত্বের বিষয়টিও তুলে ধরেন। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন সংকটে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। দেশের প্রয়োজনে দায়িত্ব পালনের জন্য দুই বাহিনীর সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বিভিন্ন সময়ে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের স্মরণ করেন। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কথাও স্মরণ করেন। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, যুদ্ধাহত ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেন।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ছাত্র-জনতাকেও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্দোলনে হতাহত ব্যক্তিদের অবদানের কথাও তার বক্তব্যে উঠে আসে।

নির্বাচনী পর্ষদ উদ্বোধনের দিনটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নেতৃত্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এদিন অ্যাডমিরাল পদে পদোন্নতি পান। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বাসস জানিয়েছে, তিনি ভাইস অ্যাডমিরাল থেকে অ্যাডমিরাল পদে উন্নীত হয়েছেন।

খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম গত ২৩ জুলাই ভাইস অ্যাডমিরাল পদে পদোন্নতি পেয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাবেক নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসানের স্থলাভিষিক্ত হন। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০২৯ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত তার নৌবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পালনের কথা রয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় চার দশকের সামরিক কর্মজীবনে খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড, স্টাফ ও প্রশিক্ষণমূলক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কমান্ডার চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চল, কমান্ডার ঢাকা নৌ অঞ্চল, কমান্ডার সাবমেরিন এবং বাংলাদেশ নেভাল একাডেমির কমান্ড্যান্টসহ বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে লেবানন ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

নির্বাচনী পর্ষদের কার্যক্রমের পাশাপাশি এদিন বিমানবাহিনীর প্রযুক্তিগত ও অপারেশনাল সক্ষমতার বিভিন্ন দিকও পর্যবেক্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল স্থাপনা ঘুরে দেখার সময় আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও কন্ট্রোল সক্ষমতা এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়।

ঢাকা সেনানিবাসে আকাশ প্রতিরক্ষা পরিচালন কেন্দ্রে স্থাপিত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের (এডিএসআই) উদ্বোধনী স্মারক ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি এ ব্যবস্থার বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।

বিমানবাহিনীর এয়ার কমান্ড অপারেশন সেন্টারও পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে ডিজিটাল লার্জ ডিসপ্লের মাধ্যমে যুদ্ধবিমানের ইন্টারসেপশন কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অপারেশনাল সক্ষমতার প্রদর্শনী দেখানো হয়। চট্টগ্রাম থেকে ইউএভির লাইভ ফিডের মাধ্যমে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সেনাসদস্য নামানোর কার্যক্রমও তিনি পর্যবেক্ষণ করেন।

প্রতিরক্ষা খাতে দেশীয় গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির আরেকটি দিক উঠে আসে বিমানবাহিনীর অ্যারোস্পেস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমপ্লেক্স পরিদর্শনের সময়। সেখানে চলমান বিভিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে ধারণা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর নিজস্ব সক্ষমতায় প্রস্তুত বিভিন্ন ধরনের মনুষ্যবিহীন আকাশযানও তার সামনে প্রদর্শন করা হয়। এসবের মধ্যে ড্রোন, কামিকাজি ড্রোন, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ও ভিটল প্রযুক্তির আকাশযান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একটি কোয়াডকপ্টারের উড্ডয়নও প্রত্যক্ষ করেন।

দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নিজস্ব প্রযুক্তি ও গবেষণার গুরুত্ব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে। আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি স্থানীয় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের সক্ষমতা গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কৌশলগত স্বনির্ভরতা বাড়তে পারে। নৌবাহিনীর ক্ষেত্রেও দেশীয় শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ডের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনী গড়ার পরিকল্পনার কথা আগে জানিয়েছে আইএসপিআর।

এদিনের অনুষ্ঠান তাই শুধু কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নির্ধারণে একটি নির্বাচনী পর্ষদের উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীতে পেশাদারিত্ব, যোগ্য নেতৃত্ব এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।

সামরিক বাহিনীর পদোন্নতি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও পেশাগত যোগ্যতার গুরুত্ব বাহিনীর ভেতরের শৃঙ্খলা ও মনোবলের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। যোগ্যতার ভিত্তিতে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক নেতৃত্বের জায়গায় নিয়ে আসা গেলে বাহিনীর কার্যকর সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই জায়গাটিই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং দক্ষতা, সততা, নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব পালনের সামর্থ্যের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের যে নির্দেশনা তিনি দিয়েছেন, সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী পর্ষদের।

‘নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধন এবং বিমানবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com