মরিয়ম হত্যা: শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবরের যাবজ্জীবন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪১ বার
মরিয়ম হত্যা: শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবরের যাবজ্জীবন

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে গৃহবধূ মরিয়ম বেগম হত্যা মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার অবসান হয়েছে। প্রায় ২১ বছর আগে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডে মরিয়মের শ্বশুর, শাশুড়ি ও দেবরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নিহতের স্বামী আবদুল মতিনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

রোববার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ চতুর্থ আদালতের বিচারক মো. শামছুল আলম এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিই আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। আদালতের এই রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মরিয়ম বেগমের শ্বশুর আবদুল মমিন, শাশুড়ি ফাতেমা বেগম এবং দেবর মো. নিজাম উদ্দিন। একই মামলায় আসামি ছিলেন মরিয়মের স্বামী আবদুল মতিন। রাষ্ট্রপক্ষ পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারলেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাঁকে খালাস দিয়েছেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তে একই মামলায় আসামিদের বিষয়ে পৃথকভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়নের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার ছুপুয়া গ্রামে পারিবারিক বিরোধের জেরে মরিয়ম বেগমকে গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। রাতের সেই ঘটনার পরদিনই মরিয়মের বাবা সোলেমান নাঙ্গলকোট থানায় গিয়ে হত্যা মামলা করেন। মামলায় তাঁর মেয়ের স্বামী আবদুল মতিন, শ্বশুর আবদুল মমিন, শাশুড়ি ফাতেমা বেগম ও দেবর মো. নিজাম উদ্দিনকে আসামি করা হয়।

একজন পরিবারের সদস্যকে হারানোর শোকের সঙ্গে সেই সময় থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্ত শেষে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এর মধ্য দিয়ে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করে।

তবে অভিযোগপত্র দাখিলের পরও দ্রুত শেষ হয়নি বিচারপ্রক্রিয়া। নানা আইনি ধাপ পেরিয়ে মামলাটি দীর্ঘ সময় আদালতে চলেছে। রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের বক্তব্য, মামলার নথিপত্র, অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ এবং আসামিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে আদালত শেষ পর্যন্ত তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন।

রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে নিহত মরিয়মের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আদালতের রায়ে তিন আসামির সাজা হওয়ায় তাঁরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে এই রায় দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তারা। বাদীপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত সরকারি কৌশলী অ্যাডভোকেট মো. ইকরাম হোসেনও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তাতে মরিয়ম হত্যার ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে।

মরিয়ম হত্যার ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের সদস্যকে হারানোর ঘটনা নয়, বরং পারিবারিক বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তারও একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে রয়েছে। ২০০৫ সালের সেই রাতের ঘটনা বহু বছর ধরে নিহতের পরিবারকে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়েছে। একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার যত দীর্ঘ হয়, ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর তার মানসিক ও সামাজিক চাপও তত দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই দীর্ঘ সময় পর হলেও আদালতের রায় পরিবারটির জন্য স্বস্তির একটি মুহূর্ত তৈরি করেছে।

তবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে অভিযোগ প্রমাণের প্রশ্ন। মামলায় চারজন আসামি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং একজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আদালত কেবল আসামি হওয়ার ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করেননি; বরং মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্রের ভিত্তিতে প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ করেছেন। এই দিকটি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় প্রমাণের গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে আসে।

আদালতের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রত্যেককে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় তাঁদের আদালতে উপস্থিত থাকার বিষয়টিও মামলার দীর্ঘ যাত্রার শেষ পর্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে থাকল।

মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও বৃহত্তরভাবে প্রশ্ন ওঠে। ২০০৫ সালে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হতে দুই দশকেরও বেশি সময় লেগেছে। যদিও ফৌজদারি মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক, নথি পর্যালোচনা এবং অন্যান্য আইনি ধাপ সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন হয়, তবু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য দ্রুত বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবার যখন বছরের পর বছর বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে, তখন মামলার প্রতিটি তারিখ তাদের কাছে নতুন প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

মরিয়ম বেগমের পরিবারের জন্য রোববারের রায় তাই শুধু একটি আদালতের সিদ্ধান্ত নয়; এটি দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া একটি বিচারিক স্বীকৃতিও। স্বজনদের সন্তোষ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অনুভূতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে রায়ের পরও আইনি প্রক্রিয়ার নির্ধারিত ধাপগুলো রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষ চাইলে আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগও থাকে। ফলে এই রায়কে মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নাঙ্গলকোটের ছুপুয়া গ্রামের সেই পুরোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে একটি নির্দিষ্ট পরিণতি পেয়েছে। মরিয়ম বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে দায় প্রমাণিত হয়েছে এবং তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতের স্বামীকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলার রায় আবারও মনে করিয়ে দিল, একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, হারানোর বেদনা এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। মরিয়মের স্বজনদের কাছে আদালতের এই রায় সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com