লোডশেডিংয়ে অক্সিজেন সংকটে সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছ নিধন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫০ বার
লোডশেডিংয়ে অক্সিজেন সংকটে সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছ নিধন

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বেনাপোলের সীমান্তবর্তী উপজেলা শার্শার সোনামুখো বিলে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ের পর অক্সিজেন সংকটে বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঘের মালিকদের দাবি, আকস্মিক এই মড়কে তাদের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছ নষ্ট হয়েছে। এক রাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে শুধু মাছ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একটি বড় মৎস্য খামারকে ঘিরে গড়ে ওঠা বহু মানুষের জীবিকা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়পুর-সোনামুখো বিলের সজনের ঘেরে। গত শনিবার রাত থেকে ঘেরের মাছ মারা যেতে শুরু করে। পরদিন সকাল হওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পানির ওপরে ভেসে ওঠে। ঘেরের কর্মীরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই মাছের মড়ক ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

খামার মালিকদের ভাষ্য, আধুনিক পদ্ধতিতে ঘেরে মাছের জন্য কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেই ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে। একপর্যায়ে বিপুলসংখ্যক মাছ পানির ওপরে উঠে আসে এবং ভোর হওয়ার আগেই মারা যেতে শুরু করে।

সোনামুখো বিলের ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরটির মালিক এ এফ মৎস্য খামার। আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন যৌথভাবে খামারটি পরিচালনা করেন। তাঁদের হিসাবে প্রায় ২০০ বিঘা আয়তনের ঘেরে ৬০ লাখ পিস পাবদা মাছ চাষ করা হয়েছিল। খামারটির উৎপাদন ও বাজারজাত কার্যক্রমকে ঘিরে বড় ধরনের বিনিয়োগও ছিল।

খামার মালিকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১৫টি পাবদা মাছের ওজন গড়ে এক কেজি ধরলে মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার মণ। বর্তমানে প্রতি মণ মাছের বাজারমূল্য আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা হিসেবে হিসাব করলে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা। তবে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে সরকারি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শন ও হিসাব প্রয়োজন।

ঘের মালিক আলফাজুল হক বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মাছের জন্য অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। তাঁর কথায়, এত বড় ক্ষতির পর কীভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শুধু মাছের মূল্য নয়, খামার পরিচালনার জন্য নেওয়া ঋণ ও বাকির চাপও এখন তাঁদের সামনে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলফাজুল হক জানান, মাছের খাদ্য বাবদ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার মালামাল বাকিতে নেওয়া হয়েছে। মাছ মারা যাওয়ার পর সেই অর্থ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

আরেক খামারি ফারুক হোসেনের কণ্ঠেও উঠে এসেছে অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, তাঁরা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছেন। এই খামারের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০০ পরিবার নির্ভরশীল। মাছের মড়কের ফলে শুধু মালিকদের বিনিয়োগ নয়, এসব পরিবারের আয়-রোজগারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

খামার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১টার পর বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সকাল হওয়ার আগেই বিপুল পরিমাণ পাবদা মাছ মারা যায়। পরে মৃত মাছ দ্রুত পচতে শুরু করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মাছগুলো বাজারজাত করার প্রস্তুতিও চলছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি উৎপাদিত মাছের একটি অংশ ভারতে রপ্তানির প্রক্রিয়াতেও ছিল।

পাবদা মাছের মতো উচ্চমূল্যের মাছের উৎপাদন শুধু স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণেই ভূমিকা রাখে না, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবহন, শ্রমিক, খাদ্য সরবরাহকারী, পাইকার ও রপ্তানি ব্যবসারও অর্থনৈতিক কার্যক্রম জড়িত। ফলে একটি বড় ঘেরে মাছের ব্যাপক মৃত্যু হলে এর প্রভাব সরাসরি মালিকের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরেও পড়তে পারে।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শার্শার অন্যান্য মৎস্যচাষিদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ঘেরে আধুনিক অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, সেখানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘ বিরতি হলে মাছের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন দ্রুত কমে যেতে পারে, যা ঘনবসতিপূর্ণ মাছের ঘেরে দ্রুত মড়কের কারণ হতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের অভিযোগ, মাছ মারা যাওয়ার পরও উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেননি। তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি সহায়তারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

মৎস্যচাষিদের দাবি, শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই হবে না, ভবিষ্যতে যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে এ ধরনের বিপর্যয় না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে মাছের ঘের, হ্যাচারি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও মৎস্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ ও পুনর্বাসন সুবিধা চান। তাঁদের আশঙ্কা, বিপুল বিনিয়োগের পর মাছ হারিয়ে যাওয়ায় নতুন করে খামার চালু করা তাঁদের একার পক্ষে কঠিন হবে। ঋণ পরিশোধ, নতুন মাছের পোনা সংগ্রহ, খাদ্য কেনা এবং ঘেরের অবকাঠামো সচল করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বেনাপোল সাব-জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মনজুরুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে লোডশেডিং চলছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বিরতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

বিদ্যুৎ বিভাগের এই ব্যাখ্যার মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাত হিসেবে মৎস্যচাষকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কীভাবে ঝুঁকিমুক্ত রাখা যায়। কারণ আধুনিক মাছ চাষে বিদ্যুৎনির্ভর অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা এখন অনেক খামারের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু উৎপাদন ব্যাহত নয়, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সোনামুখো বিলের ঘটনাটি সেই ঝুঁকিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একটি রাতের দীর্ঘ লোডশেডিং কীভাবে কয়েক কোটি টাকার বিনিয়োগকে বিপর্যস্ত করতে পারে, এই ঘটনা তার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কৃষি ও মৎস্য খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা এখন কেবল নাগরিক সুবিধার বিষয় নয়; এটি সরাসরি উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা এখন অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্তের। তাঁদের প্রত্যাশা, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ তাঁদের কাছে এই মাছগুলো শুধু পানিতে বেড়ে ওঠা সম্পদ ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বহু পরিবারের আয়, ব্যবসার ঋণ, কর্মসংস্থান এবং আগামী দিনের স্বপ্ন।

সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছ হারানোর এই ঘটনা তাই শুধু একটি মৎস্য খামারের ক্ষতির হিসাব নয়। এটি বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আধুনিক কৃষি ও মৎস্যচাষের ঝুঁকি এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এমন ক্ষতি ভবিষ্যতে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় চাষিরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com