পাটের ভালো দামে শাহজাদপুরের কৃষকের মুখে হাসি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৫ বার
পাটের ভালো দামে শাহজাদপুরের কৃষকের মুখে হাসি

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে দীর্ঘদিন পর সোনালি আঁশের সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। আশাতীত ফলন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় পাটচাষিদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। একসময় ধারাবাহিক লোকসান ও উৎপাদন খরচের কারণে পাটচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া অনেক কৃষক এবার নতুন করে এই ফসলের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন পাট নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কোথাও খাল-বিল কিংবা পানিতে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আঁশ ছাড়ানোর কাজ চলছে। আবার বাড়ির আঙিনা ও খোলা জায়গায় শুকানো হচ্ছে সোনালি আঁশ এবং পাটকাঠি। ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্যের আশায় কৃষকের এই ব্যস্ততা এখন শাহজাদপুরের গ্রামীণ জনপদে এক পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে।

চলতি মৌসুমে শাহজাদপুরে পাটের উৎপাদন আশাব্যঞ্জক হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্র। উপজেলার পৌরসভাসহ ১৩টি ইউনিয়নে মোট ৪১৮ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ বছর দেশি পাটের পাশাপাশি মেছতা, কেনাফ, জেআরও-৫২৪, সবুজ সোনা, বারি-১ এবং রবি-১ জাতের পাট চাষ করেছেন কৃষকরা।

কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত পাট উৎপাদন হয়েছে। জমি প্রস্তুত, বীজ, শ্রমিক, সারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

তবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় এবার বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় হাটবাজার এবং পার্শ্ববর্তী বাজারগুলোতে পাটের মানভেদে প্রতি মণ প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

পাটের মূল আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠিও কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। শুকনো পাটকাঠি জ্বালানি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় এরও বাজার রয়েছে। ফলে একই জমি থেকে পাটের আঁশ বিক্রির পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করেও কৃষকরা অতিরিক্ত আয় করছেন।

শাহজাদপুরের পাড়কোলা গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম বলেন, দীর্ঘদিন পর কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে তিনি আবার পাটচাষ করেছেন। মৌসুমজুড়ে আবহাওয়া ও জমির পরিচর্যা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে পাট বিক্রি করে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো দাম পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট।

তার মতো অনেক কৃষকের কাছেই এবার পাটচাষ শুধু একটি মৌসুমি ফসল উৎপাদন নয়, বরং দীর্ঘদিনের হতাশার পর নতুন করে লাভের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অতীতে বাজারদর কম থাকায় পাট উৎপাদন করেও অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত লাভ পাননি। সেই অভিজ্ঞতার কারণে অনেকেই ধান, সরিষা বা অন্যান্য ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন।

গাড়াদহ গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ চলতি বছর সাড়ে তিন বিঘা জমিতে পাটচাষ করেছেন। ভালো ফলন ও বাজারদরের কারণে তিনি আগামী মৌসুমেও পাটের আবাদ অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদী। কৃষকদের মতে, একটি ফসলের বাজারদর ভালো থাকলে শুধু সেই মৌসুমের লাভই নয়, ভবিষ্যৎ কৃষি পরিকল্পনাতেও তার প্রভাব পড়ে।

খামারশালিনা গ্রামের কৃষক ইয়াকুব আলী এ বছর চার বিঘা জমিতে পাটচাষ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘা জমির পাট ইতোমধ্যে প্রতি মণ ৩ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চার বিঘা জমিতে বিঘাপ্রতি গড়ে প্রায় ১১ মণ করে পাট উৎপাদন হয়েছে।

ফসল উৎপাদনের সময় কৃষকদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে বাজারমূল্য নিয়ে। ভালো ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকের লাভ থাকে না। আবার বাজারদর ভালো হলেও ফলন কম হলে উৎপাদন ব্যয় ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। এবার শাহজাদপুরের অনেক কৃষকের ক্ষেত্রে ভালো ফলন এবং তুলনামূলক ভালো বাজারমূল্য—দুইয়ের সমন্বয় ঘটেছে।

একই গ্রামের কৃষক দুলাল সরকার দুই বিঘা জমিতে পাটচাষ করেছেন। তিনি জানান, দুই বিঘা জমি থেকে উৎপাদিত প্রায় ২০ মণ পাট গড়ে ৪ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন। তার মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য ভালো বাজারদর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের পুঁজি সীমিত এবং একটি মৌসুমের লাভ-লোকসানের ওপর পরবর্তী মৌসুমের কৃষি পরিকল্পনা অনেকাংশে নির্ভর করে।

রূপবাটি ইউনিয়নের কৃষক আবুল কালাম জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে পাটচাষ করেছেন। এলাকায় এখন অনেক কৃষক পাট থেকে আঁশ ছাড়ানো এবং তা শুকানোর কাজে ব্যস্ত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারে পাটের মান অনুসারে প্রতি মণ প্রায় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যাচ্ছে।

শাহজাদপুরের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যাচ্ছে, পাট মৌসুমকে ঘিরে গ্রামীণ জনজীবনে কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। পাট কাটা থেকে শুরু করে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে শ্রমের প্রয়োজন হয়। ফলে পাট মৌসুম স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিশ্রমিকদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশে পাটকে দীর্ঘদিন ধরে ‘সোনালি আঁশ’ নামে অভিহিত করা হয়। একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের অন্যতম ছিল এই পাট। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্ববাজার, কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার এবং বাজার ব্যবস্থার নানা পরিবর্তনের কারণে পাটশিল্প নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে পাটের সম্ভাবনা নিয়ে আবারও আলোচনা হচ্ছে।

পাট একটি বহুমুখী ফসল। এর আঁশ থেকে প্রচলিত বস্তা ও দড়ি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা যায়। পাটকাঠিও জ্বালানি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার হয়। ফলে পাটচাষে কৃষকের আয়ের একাধিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, কৃষকদের পাটচাষে উৎসাহিত করতে মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে ১০০ জন কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে পাটের বীজ বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে উন্নত জাত নির্বাচন, জমি প্রস্তুত এবং পরিচর্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, শাহজাদপুরে এবার ৪১৮ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

তার মতে, উপযুক্ত পরিকল্পনা ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে পাটচাষ থেকে কৃষক লাভবান হতে পারেন। এ অঞ্চলের অনেক কৃষক ধান ও সরিষা চাষের পর জমি পতিত রাখতেন। কৃষি বিভাগের উৎসাহে এবার সেই জমির একটি অংশে পাটচাষ করা হয়েছে এবং অনেক কৃষক আশাতীত ফলন পেয়েছেন।

বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় আগামী মৌসুমে শাহজাদপুরে পাটচাষের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তবে কৃষকদের প্রত্যাশা, শুধু একটি মৌসুমে ভালো দাম পেলেই হবে না; দীর্ঘমেয়াদে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষকরা মনে করেন, বাজারব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকলে এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য পাওয়া গেলে পাটচাষ আরও লাভজনক হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত বীজ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং সহজ বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই অঞ্চলে পাট উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

শাহজাদপুরের মাঠে এখন তাই শুধু শুকানো পাটের সোনালি রং নয়, দেখা যাচ্ছে নতুন আশার ছবিও। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্য কৃষকদের আবার পাটচাষের দিকে ফিরিয়ে আনছে।

তবে কৃষকদের এই হাসি দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। কারণ কৃষকের কাছে একটি ভালো মৌসুম শুধু সাময়িক লাভের হিসাব নয়; এটি আগামী দিনের ফসল, পরিবারের স্বপ্ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

শাহজাদপুরের কৃষকদের আশা, সোনালি আঁশের এই সুদিন যেন ক্ষণস্থায়ী না হয়। ন্যায্যমূল্য ও প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি কৃষক পাটচাষে ফিরে আসবেন এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী এই ফসল আবারও কৃষি অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com