ডিজিটাল যুগেও বিচ্ছিন্ন কুরুকপাতার পাহাড়ি জনপদ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৬ বার
ডিজিটাল যুগেও বিচ্ছিন্ন কুরুকপাতার পাহাড়ি জনপদ

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যখন মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং অনলাইনভিত্তিক সরকারি সেবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, তখনও ডিজিটাল যোগাযোগের বাইরে রয়ে গেছে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নের বহু মানুষ। মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি এই জনপদে এখনো এমন অনেক এলাকা রয়েছে, যেখানে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, ইন্টারনেট সংযোগ নেই এবং বিদ্যুতের সুবিধাও সীমিত।

ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার দিকে দেশের অগ্রযাত্রার মধ্যেও কুরুকপাতার মানুষের জীবন যেন চলছে ভিন্ন এক বাস্তবতায়। জরুরি প্রয়োজনে স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা থেকে শুরু করে সরকারি ভাতার আবেদন, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য কিংবা স্বাস্থ্যসেবা—সব ক্ষেত্রেই দুর্গমতার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

চার নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাহাড়, বন এবং দুর্গম সড়ক পেরিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি লাগে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেটের অভাব। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা যেখানে দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনকে সহজ করে তুলছে, সেখানে কুরুকপাতার অনেক বাসিন্দার কাছে একটি সাধারণ ফোনকলও কখনো কখনো কঠিন হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। প্রয়োজনের সময় পরিবারের সদস্য, স্বজন কিংবা জরুরি সেবার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় কোনো অসুস্থতা বা জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দা মেসা ম্রো ও অর্জন ত্রিপুরা জানান, মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় সাধারণ যোগাযোগও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় অনলাইনভিত্তিক সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও স্থানীয় মানুষ পিছিয়ে রয়েছেন। বর্তমানে জন্মনিবন্ধন, বিভিন্ন সরকারি আবেদন, তথ্য যাচাই এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নানা প্রক্রিয়া অনলাইনের সঙ্গে যুক্ত হলেও কুরুকপাতার বাসিন্দাদের জন্য এসব সেবা সহজলভ্য নয়।

বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা কিংবা মাতৃত্বকালীন ভাতার মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্যও অনেককে ইউনিয়নের বাইরে যেতে হয়। অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়া বা আবেদন করার জন্য উপজেলা সদরের দিকে ছুটতে হয় স্থানীয়দের। কিন্তু পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য উপজেলা সদরে যাওয়া শুধু একটি সাধারণ যাত্রা নয়; অনেকের ক্ষেত্রে এটি সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং শারীরিকভাবে কষ্টকর একটি পথচলা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউনিয়নের কিছু দুর্গম এলাকা থেকে আলীকদম উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত। পাহাড়ি ও দুর্গম সড়ক দিয়ে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় লাগে। যানবাহনের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় ভাড়াও তুলনামূলক বেশি। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য একটি সরকারি সেবা নিতে কয়েক দফা যাতায়াত কখনো কখনো বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে।

কুরুকপাতা ইউনিয়নে স্থায়ী ডিজিটাল সেন্টার না থাকাও স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে সহজে অনলাইনভিত্তিক সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি না হওয়ায় নাগরিকদের বিভিন্ন কাজের জন্য দূরে যেতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউনিয়নের নিজস্ব স্থায়ী প্রশাসনিক অবকাঠামোর অভাবের কথাও জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জগৎ চন্দ্র ত্রিপুরা ও কাম্পুক ম্রো বলেন, স্থায়ী প্রশাসনিক অবকাঠামো না থাকায় সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিতে সমস্যায় পড়তে হয়। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবা চালু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের প্রয়োজন বিবেচনা করে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানকার মানুষের কাছে একটি সাধারণ নাগরিক সেবা পৌঁছে দিতে বাড়তি পরিকল্পনা ও অবকাঠামো প্রয়োজন হয়।

কুরুকপাতার সংকট শুধু যোগাযোগ কিংবা সরকারি সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা। ইউনিয়নে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের দূরের এলাকায় গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়।

পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। ফলে সন্তানকে প্রতিদিন দূরের বিদ্যালয়ে পাঠানো কিংবা অন্য এলাকায় রেখে পড়াশোনা করানোর সক্ষমতা সবার নেই। এ কারণে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর অনেক শিক্ষার্থীর নিয়মিত পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

কুরুকপাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু শামা বলেন, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক অভিভাবকের পক্ষেই সন্তানদের দূরের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে প্রাথমিক স্তর পার হওয়ার পর কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ে।

ডিজিটাল সুবিধার অভাব শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি করছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী, ভিডিও পাঠ, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং নানা তথ্যভিত্তিক উপকরণ ব্যবহার করতে পারছে। কিন্তু কুরুকপাতার শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

প্রধান শিক্ষক আবু শামা জানান, ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি শুধু অতিরিক্ত সুবিধা নয়, শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় ইন্টারনেটবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

যোগাযোগ ও ইন্টারনেট সংকটের প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবাতেও। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষ জরুরি সময়ে দ্রুত তথ্য পাওয়া কিংবা চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হন। কোনো রোগী গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে উপজেলা সদর কিংবা আরও দূরের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়।

পাহাড়ি পথ ও সীমিত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এই যাত্রা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা চাওয়া সহজ হতে পারত বলে মনে করেন স্থানীয়রা। কিন্তু নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দিতেও বিলম্ব হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, দুর্গম অঞ্চলে বসবাস করলেও তারা দেশের নাগরিক এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সরকারি সেবার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখেন। পাহাড়ি জনপদের ভৌগোলিক বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেই বাস্তবতা যেন মানুষের মৌলিক সেবা পাওয়ার পথে স্থায়ী বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—এমন প্রত্যাশাই তাদের।

কুরুকপাতার মতো প্রত্যন্ত এলাকার উন্নয়নে শুধু সড়ক নির্মাণ যথেষ্ট নয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, বিদ্যুৎ সুবিধা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

বিশেষ করে ইউনিয়নে একটি কার্যকর ডিজিটাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা গেলে স্থানীয়দের অনেক দুর্ভোগ কমতে পারে। জন্মনিবন্ধন, সরকারি ভাতার আবেদন, বিভিন্ন অনলাইন ফরম পূরণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের মতো কাজ ইউনিয়নেই করা সম্ভব হবে। এতে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা সদরে যাওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মোবাইল টাওয়ার ও ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে কুরুকপাতাকে দেশের মূল ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা হবে। বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারিত হলে সরকারি সেবা, শিক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

পাহাড়ের পর পাহাড় আর দুর্গম পথের আড়ালে থাকা কুরুকপাতার মানুষের জীবন তাই উন্নয়নের আরেকটি বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সুফল দেশের শেষ প্রান্তের মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়।

ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে কুরুকপাতার মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা চায় জরুরি প্রয়োজনে ফোনে কথা বলতে, সন্তানদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ দিতে, অসুস্থ হলে দ্রুত সহায়তা পেতে এবং সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য দিনের পর দিন পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে না হয়।

বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প তখনই আরও পূর্ণতা পাবে, যখন কুরুকপাতার মতো দুর্গম জনপদও সেই অগ্রযাত্রার অংশ হবে। পাহাড়ের দূরত্ব যেন প্রযুক্তির দূরত্ব না হয়ে দাঁড়ায়—কুরুকপাতার মানুষের আজকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা যেন সেটিই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com