চীনের ঝুঁকিতে ভারতে জাপানের বিনিয়োগ বাড়ছে

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫৮ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চীনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জনসংখ্যা সংকোচন ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কজনিত চাপের কারণে জাপানি কোম্পানিগুলো বিকল্প প্রবৃদ্ধির বাজার হিসেবে ভারতের দিকে আরও জোরালোভাবে ঝুঁকছে। খুচরা ব্যবসা থেকে ব্যাংকিং, উৎপাদন ও প্রযুক্তি—বিভিন্ন খাতে জাপানের বড় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের গতি এখন স্পষ্টভাবে বাড়ছে।

দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল সম্প্রতি জাপান সফর করেছেন। তিনি দেশটির সর্বকালের বৃহত্তম ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। সফরটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ভারতের বাজারে জাপানি কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।

মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর মতো বড় শহরের বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক এলাকায় জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর উপস্থিতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও মুজি এবং স্পোর্টস জুতা নির্মাতা ওনিতসুকা টাইগার ভারতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা দ্রুত সম্প্রসারণ করছে।

নতুন প্রতিষ্ঠানও ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করছে। জাপানের আসবাবপত্র নির্মাতা নিটোরি সম্প্রতি ভারতে কার্যক্রম শুরু করেছে। সুবিধাজনক পণ্য বিক্রির দোকান পরিচালনাকারী লসনও ভারতীয় বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি মুম্বাই থেকে কার্যক্রম শুরু করে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে ১০ হাজার দোকান খোলার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।

জাপানের বিনিয়োগ শুধু ভোক্তা পণ্যের খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের আর্থিক খাতেও জাপানি ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বেড়েছে। বিদেশি কিছু ঋণদাতা যখন ভারতীয় ব্যাংকিং খাত থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করছে, তখন জাপানি ব্যাংকগুলো বিপরীত পথে হাঁটছে।

জাপানের সবচেয়ে বড় ব্যাংক মিতসুবিশি ইউএফজে ব্যাংক গত বছর প্রায় ৪৪০ কোটি ডলারে ভারতীয় অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণদাতা শ্রীরাম ফাইন্যান্সের ২০ শতাংশ অংশীদারিত্ব কেনার চুক্তি সম্পন্ন করে। এটি ভারতের আর্থিক খাতে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

একই সময়ে সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাংকিং করপোরেশন ভারতের ইয়েস ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শেয়ারধারী হয়েছে। ব্যাংকটি ইয়েস ব্যাংকের ২৪ দশমিক ২২ শতাংশ অংশীদারিত্ব অধিগ্রহণ করেছে।

ভারতে জাপানি বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেলয়েটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ১০০টিরও বেশি জাপানি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্রে গবেষণা ও উন্নয়ন, করপোরেট কৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

জাপানি কোম্পানিগুলোর ভারতের প্রতি আগ্রহের পেছনে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুজুকি মোটর করপোরেশনের সহায়তায় পরিচালিত বিনিয়োগ তহবিল নেক্সট ভারত ভেঞ্চার্সের প্রতিষ্ঠাতা বিপুল নাথ জিন্দালের মতে, গত ১৬-১৭ বছর ধরে জাপানের স্থানীয় জনসংখ্যা কমছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও সীমিত হচ্ছে।

অন্যদিকে জাপানের প্রচলিত আন্তর্জাতিক বাজারগুলোও নানা কারণে কঠিন হয়ে উঠেছে। চীনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কনীতি ব্যবসার পরিবেশকে আরও কঠিন করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি বাজার আবার আকারে তুলনামূলক ছোট।

এই বাস্তবতায় ভারতের বিশাল ভোক্তা বাজার, জনসংখ্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করছে।

ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। প্রায় দেড় দশক আগে দুই দেশ বাণিজ্য উদারীকরণের লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক ‘বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। একই সময়ে ভারতে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়।

দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প। জাপানের শিনকানসেন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তবে বর্তমান বিনিয়োগ পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জাপানের বেসরকারি কোম্পানিগুলোই সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখছে। জুলাইয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দিল্লি সফরের সময় অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে জাপানি কোম্পানিগুলো প্রায় ১২০টি চুক্তির মাধ্যমে ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। সেমিকন্ডাক্টর থেকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি—বিভিন্ন খাতে এসব বিনিয়োগ হওয়ার কথা।

ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলও বলেছেন, জাপানের ১০ লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জিত হতে পারে।

বড় করপোরেশনের পাশাপাশি জাপানের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানিগুলোও ভারতমুখী হচ্ছে। জাপানের হামামাতসু শহর সম্প্রতি ‘হামামাতসু ইন্ডিয়া কমিটি’ গঠন করেছে। সুজুকি, হোন্ডা ও ইয়ামাহার মতো কোম্পানির সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত এই শহরের ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে, সেটিই কমিটির অন্যতম লক্ষ্য।

তবে জাপানের ভারতমুখী বিনিয়োগকে সরাসরি চীন থেকে সরে যাওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তোশিরো নিশিজায়েভার মতে, এটি বরং জাপানি কোম্পানিগুলোর বাজার বৈচিত্র্যকরণের কৌশলের অংশ। অর্থাৎ, মূলধনের পুনর্বিন্যাসটি অনেকাংশে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হচ্ছে।

জাপানি কোম্পানিগুলো একযোগে চীন ছাড়ছে না। বরং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর তারা অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। অস্ট্রেলিয়ার লোয়ি ইনস্টিটিউটের ভারতবিষয়ক চেয়ার শ্রুতি পাণ্ডালাইয়ের মতে, ভারত চীন-সম্পর্কিত ঝুঁকির বিরুদ্ধে জাপানের জন্য এক ধরনের সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে।

এদিকে ভারতের জন্য জাপানের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও উন্নত উৎপাদন খাতে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এসব ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে সম্পর্কের সামনে বাধাও রয়েছে। করব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জমি ও পরিবেশগত অনুমোদনে বিলম্ব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। জাপানি বিনিয়োগকারীরাও এসব সমস্যার বাইরে নন।

বুলেট ট্রেন প্রকল্পের বিলম্ব নিয়ে জাপানের এক সাবেক মন্ত্রীর প্রকাশ্য সমালোচনা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। তিনি ভারতকে নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতির অভিযোগ করেন। ভারত সরকার অবশ্য তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ফলে জাপানি বিনিয়োগের গতি ধরে রাখতে ভারতকে শুধু বড় চুক্তি করলেই হবে না, সেগুলোর বাস্তবায়নেও দক্ষতা দেখাতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি কমিয়ে বিকল্প সরবরাহ ও উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তাতে ভারত বড় সুবিধাভোগী হতে পারে। তবে সেই সুযোগ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে ব্যবসার পরিবেশ, অবকাঠামো ও নীতিগত স্থিতিশীলতা আরও উন্নত করার প্রয়োজন থাকবে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com