প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
১৯৯৩ সালে মাত্র ১৫ দিনের ভিসায় জাপানে প্রবেশ করেছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার ৭২ বছর বয়সী এক নাগরিক। এরপর প্রায় ৩৩ বছর ধরে অবৈধভাবে দেশটিতে বসবাসের অভিযোগে অবশেষে তাকে গ্রেপ্তার করেছে জাপানের পুলিশ।
জাপানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তির নাম মুন জং-গি। ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে নিজের ছোট ভাইয়ের পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি জাপানে প্রবেশ করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় জাপানে বেশি অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে—এমন আশায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। পরে দিনমজুরি ও বিভিন্ন অস্থায়ী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
দীর্ঘদিন জাপানে অবস্থানের বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে ২০২৬ সালের জুনে। অবৈধভাবে বসবাসরত এক ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ২৬ আগস্ট শিজুওকা প্রদেশের পুলিশ অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের সন্দেহে মুন জং-গিকে গ্রেপ্তার করে।
ছোট ভাইয়ের পাসপোর্টে জাপানে প্রবেশ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানে প্রবেশের সময় মুনকে মাত্র ১৫ দিন অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে নিজের পাসপোর্টের পরিবর্তে তিনি ছোট ভাইয়ের পাসপোর্ট ব্যবহার করেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
নির্ধারিত সময় শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিরে না গিয়ে তিনি জাপানেই থেকে যান এবং কাজ শুরু করেন। পুলিশকে দেওয়া বক্তব্যে মুন জানান, অর্থনৈতিক কারণেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল, নিজ দেশের তুলনায় জাপানে বেশি অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে।
এরপর কোনো বৈধ ভিসা বা বসবাসের অনুমতি ছাড়াই কয়েক দশক ধরে তিনি জাপানে অবস্থান করেন।
তথ্যের ভিত্তিতে শুরু হয় তদন্ত
পুলিশ জানিয়েছে, নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে মুন জং-গির অবস্থান শনাক্ত হয়নি। ২০২৬ সালের জুনে পাওয়া একটি বিশেষ তথ্যের ভিত্তিতে শিজুওকা প্রাদেশিক পুলিশ তার অভিবাসনসংক্রান্ত নথি ও অবস্থান নিয়ে তদন্ত শুরু করে।
২৬ আগস্ট গ্রেপ্তারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অভিযোগ স্বীকার করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে জাপানে বসবাস করতে পেরেছেন, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
৩৩ বছর থাকলেও আইনি হিসাবে ২৬ বছর
মুন জং-গি প্রায় ৩৩ বছর জাপানে অবস্থান করলেও তার বিরুদ্ধে আইনি অপরাধের সময়কাল নিয়ে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
জাপানের অভিবাসন আইন অনুযায়ী, ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইন সংশোধনের পর অবৈধভাবে বসবাসকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে মুনের ক্ষেত্রে ওই সংশোধনের পরের সময় থেকে অপরাধের হিসাব করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, প্রায় ৩৩ বছর জাপানে অবস্থান করলেও বর্তমান আইনি প্রক্রিয়ায় তার অবৈধ অবস্থানের অপরাধের সময়কাল প্রায় ২৬ বছর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দিনমজুরি ও অস্থায়ী কাজ করে জীবনযাপন
জাপানে অবস্থানকালে মুন মূলত দিনমজুরি ও বিভিন্ন ছোটখাটো অস্থায়ী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে এত দীর্ঘ সময় তিনি কোথায় কোথায় কাজ করেছেন, কীভাবে বাসস্থান ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় পরিচালনা করেছেন, সে বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
বৈধ অভিবাসন নথি ছাড়া একজন ব্যক্তি কীভাবে প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে জাপানে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করেছেন, সেটিও তদন্তের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
১৯৯৩ থেকে ২০২৬: অবৈধ বসবাসের চিত্র বদলেছে
মুন জং-গি যখন জাপানে প্রবেশ করেন, তখন দেশটির অবৈধ অভিবাসীসংক্রান্ত পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক বড় ছিল।
জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে দেশটিতে প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৪৬ জন অবৈধ প্রবাসী ছিলেন। কঠোর অভিবাসন নীতি, নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ফলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬৮ হাজার ৪৮৮ জনে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেও মুনের মতো দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বসবাসকারী ব্যক্তির ঘটনা জাপানের অভিবাসন ব্যবস্থার সামনে একটি ব্যতিক্রমী চিত্র তুলে ধরেছে।
চলমান আইনি প্রক্রিয়া
২৬ আগস্ট গ্রেপ্তারের পর মুন জং-গির বিরুদ্ধে জাপানের অভিবাসন আইন অনুযায়ী তদন্ত চলছে। তিনি অভিযোগ স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সাজা, বহিষ্কার বা অন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
দীর্ঘ ৩৩ বছর জাপানে থাকার পর ৭২ বছর বয়সে গ্রেপ্তার হওয়া মুন জং-গির ঘটনাটি দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে নজর এড়িয়ে থাকা অবৈধ বসবাসের একটি বিরল উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।