ঘুষসাইটে সরকারি খাতের দুর্নীতির চিত্র, জমা ৪৫৮ অভিযোগ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৩ বার

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের দাবির অভিজ্ঞতা এবার বেনামে নথিবদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে ‘ঘুষসাইট’ নামের একটি নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। দুই তরুণ বাংলাদেশি উদ্যোক্তার তৈরি এই ওয়েবসাইটে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা বা ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ না করেই সরকারি দপ্তর, সেবার ধরন, আনুমানিক অবস্থান, দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ এবং ঘুষ দেওয়ার পর কী ঘটেছে—এসব তথ্য জানাতে পারছেন ব্যবহারকারীরা।

গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে অভিযুক্ত করা নয়; বরং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুষের দাবির যে অনানুষ্ঠানিক চিত্র রয়েছে, তা ধারাবাহিকভাবে নথিবদ্ধ করা। নির্মাতাদের ভাষ্য, পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষের অভিজ্ঞতা এক জায়গায় জমা হলে সেখান থেকে দুর্নীতির নির্দিষ্ট প্রবণতা বা প্যাটার্ন চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।

ঘুষসাইটের অন্যতম নির্মাতা সাইফ কবির বলেন, বাংলাদেশের প্রায় সবাই ঘুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন। কিন্তু কোথায় কত টাকা দাবি করা হয়, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। সেই তথ্যের ঘাটতি পূরণ করতেই তাঁরা একটি পাবলিক লেজার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন।

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন নাগরিক কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, নামজারি বা অন্য কোনো সেবা নিতে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক অর্থের দাবি পেলে সেটি ঘুষসাইটে জানাতে পারেন। ফলে ভবিষ্যতে একই দপ্তরে সেবা নিতে যাওয়া অন্য ব্যক্তিরা আগে থেকেই একটি সম্ভাব্য ধারণা পেতে পারেন।

সাইফ জানান, ভারতের ‘bribes.fyi’ ওয়েবসাইট থেকে তাঁরা ধারণাটি পেয়েছেন। পরে তিনি তাঁর বন্ধু ও সহ-নির্মাতা সাহেদ শরীফের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁদের দাবি, বাংলাদেশি বাস্তবতার উপযোগী প্ল্যাটফর্মটি মাত্র একদিনের মধ্যে তৈরি করা হয়।

চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়েবসাইটটিতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রিপোর্ট জমা পড়তে শুরু করেছে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগ থেকে মোট ৪৫৮টি রিপোর্ট জমা পড়ে। এসব রিপোর্টে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ঘুষের দাবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে ঢাকা বিভাগ থেকে এসেছে সর্বোচ্চ ২৫৪টি রিপোর্ট। চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ৯৮টি, সিলেট থেকে ২৪টি, রাজশাহী ও খুলনা থেকে ২২টি করে, ময়মনসিংহ থেকে ১৬টি, রংপুর থেকে ১৫টি এবং বরিশাল থেকে সাতটি রিপোর্ট জমা পড়েছে।

তবে এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য ব্যবহারকারীদের নিজেদের দেওয়া এবং সেগুলো অযাচাইকৃত। অর্থাৎ রিপোর্টে যে পরিমাণ ঘুষের দাবি করা হয়েছে, তা কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে যাচাই করেনি। ফলে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গড় ঘুষের পরিমাণকে দেশের সরকারি সেবায় ঘুষের প্রকৃত বা স্বাভাবিক হার হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রিপোর্টগুলোর গড় ঘুষের দাবি ছিল ৩৩ হাজার ৭৪৭ টাকা। তবে জমি, কাস্টমস ও করসংক্রান্ত কয়েকটি বড় অঙ্কের অভিযোগ গড় পরিমাণকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

ঘুষসাইট কীভাবে কাজ করে

প্ল্যাটফর্মটিতে তথ্য দেওয়ার প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সরল। ব্যবহারকারীকে সরকারি দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, আনুমানিক অবস্থান, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ এবং ঘুষ দাবি করার পর শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে—এসব তথ্য দিতে হয়। তবে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নাম, ফোন নম্বর বা ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ না করার নির্দেশ রয়েছে।

রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর সেটি স্বয়ংক্রিয় একটি মডারেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। নির্মাতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করে নাম, ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ফাইল নম্বর বা অন্য কোনো শনাক্তকারী তথ্য সরিয়ে দেওয়া হয়। আপত্তিকর ভাষা ও স্প্যামও বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তবে এই প্রক্রিয়াকে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন না নির্মাতারা। সাইফ কবিরের ভাষ্য, এটি মূলত প্রাইভেসি ফিল্টার। কোনো ঘটনা সত্যিই ঘটেছে কি না, সেটি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় না।

ঘুষসাইটের ওয়েবসাইটেও রিপোর্টগুলোকে অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে, প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে নয়। ফলে কোনো রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে কঠোর নিয়মগুলোর একটি হলো ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ না করা। নির্মাতাদের মতে, এটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অভিযোগের প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং সরকারি সেবা ব্যবস্থায় অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করার একটি উদ্যোগ।

প্যাটার্ন শনাক্ত করাই মূল লক্ষ্য

একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা কঠিন হলেও একই দপ্তর বা সেবার ক্ষেত্রে বহু মানুষের কাছ থেকে কাছাকাছি ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে একটি প্রবণতা শনাক্ত হতে পারে—এমন ধারণা থেকে ঘুষসাইটটি তৈরি করা হয়েছে।

সাইফের মতে, একটি লাইসেন্সের জন্য একজন ব্যক্তি ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা জানালে সেটি শুধু একটি অভিজ্ঞতা। কিন্তু একই অফিসের বিষয়ে যদি কয়েক ডজন মানুষ কাছাকাছি অঙ্কের ঘুষ দাবির কথা জানান, তাহলে সেটি একটি সম্ভাব্য প্যাটার্নের ইঙ্গিত দিতে পারে।

এই তথ্য সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের পাশাপাশি সাংবাদিক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্যও কাজে লাগতে পারে বলে মনে করেন নির্মাতারা। তাঁদের প্রত্যাশা, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের অভিজ্ঞতা পাওয়া মানুষ অন্তত বেনামে সেই তথ্য প্রকাশ করলে এতদিন আড়ালে থাকা অনেক অভিজ্ঞতা একটি উন্মুক্ত ডাটাবেসে জমা হবে।

ইতোমধ্যে সাইটে বিভিন্ন সরকারি সেবা নিয়ে অভিযোগও দেখা যাচ্ছে। একটি রিপোর্টে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) একটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। আরেকটি রিপোর্টে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী অঞ্চলে জন্মনিবন্ধনের জন্য ১০ হাজার টাকা দাবির কথা বলা হয়েছে।

তবে এসব তথ্যও যাচাই করা হয়নি—এ বিষয়টি নির্মাতারা স্পষ্ট করেছেন। তাঁদের মতে, রিপোর্টগুলোকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার না করে সম্ভাব্য দুর্নীতির প্রবণতা শনাক্ত করার প্রাথমিক তথ্য হিসেবে দেখা উচিত।

ঘুষসাইট পরিচালিত হচ্ছে মূলত নির্মাতাদের নিজস্ব অর্থায়নে। পাশাপাশি আগ্রহী ব্যবহারকারীদের অনুদানের সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে রিপোর্ট জমা দিতে কোনো ফি বা অনুদান প্রয়োজন হয় না।

নির্মাতারা আরও জানিয়েছেন, সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর বিকল্প হিসেবে ঘুষসাইট তৈরি করা হয়নি। বরং এটি একটি সচেতনতামূলক পাবলিক লেজার, যেখানে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা এক জায়গায় সংরক্ষিত থাকবে।

বাংলাদেশের সরকারি সেবা খাতে ঘুষ ও অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। নতুন এই উদ্যোগ সেই অভিযোগগুলোকে একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে ব্যবহারকারীদের অংশগ্রহণ, তথ্যের ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যতে এসব তথ্য কীভাবে বিশ্লেষণ ও যাচাই করা হয় তার ওপর।

রিপোর্টের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি একই দপ্তর, একই ধরনের সেবা বা একই ধরনের অর্থ দাবির পুনরাবৃত্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাহলে ঘুষসাইটটি সরকারি সেবায় দুর্নীতির সম্ভাব্য প্রবণতা বোঝার একটি প্রাথমিক তথ্যসূত্রে পরিণত হতে পারে। তবে প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা জরুরি।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত