নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যার নেপথ্যে কী?

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অতিবৃষ্টির পর আকস্মিকভাবে নেমে আসা পানির স্রোতে নেপালের সীমান্তবর্তী রাসুয়া এলাকার সড়ক, সেতু, বাড়িঘর এবং বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে তিব্বতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বন্যা ও ভূমিধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কী ঘটেছিল

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিবৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় একটি ভূমিকম্প বা ভূকম্পনজনিত ঘটনার প্রভাব যুক্ত হয়ে এই বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ধারণা অনুযায়ী, একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটি নেপালের লেন্দে খোলা নদীতে ধসে পড়তে পারে। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসে এবং আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।

লেন্দে খোলা নদী নেপাল ও তিব্বতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এর উজানে কোনো ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে তা নিচের দিকে বসবাসকারী মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বন্যার স্রোতে নদীর আশপাশের জনবসতি, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক পলি ও কাদামাটি জমেছে।

দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা

উদ্ধারকাজ চললেও বিপদ পুরোপুরি কেটে যায়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লেন্দে খোলা নদীর উজানে এখনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে রয়েছে। সেখানে পানি ও ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় যেকোনো সময় নতুন করে বড় ধরনের পানির প্রবাহ নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।

এ কারণে নদীর তীরবর্তী এবং নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বন্যা মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনও প্রস্তুতি নিচ্ছে।

হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর কারণে নেপালের পাশাপাশি ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব নদী পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে ভারতের সমতল এলাকায় প্রবাহিত হওয়ায় উজানের অতিরিক্ত পানির প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে আরও বিস্তৃত এলাকায় পড়তে পারে।

ভেঙে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা

বন্যার পানির প্রবল স্রোত ও ভূমিধসে বেশ কয়েকটি সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি টেলিযোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে। ফলে দুর্গত এলাকায় অবস্থানরত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় উদ্ধারকারী দলকে অনেক জায়গায় বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানি ও কাদামাটি না কমা পর্যন্ত হেলিকপ্টার অবতরণ করানোও সম্ভব হচ্ছে না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

নিখোঁজ শত শত মানুষ

দুর্যোগের কয়েক ঘণ্টা পরও বিপুলসংখ্যক মানুষের নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটক এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় কর্মরত বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, তিনজন মার্কিন নাগরিক এবং ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

এ ছাড়া ১৭ জন মালয়েশীয়, চারজন দক্ষিণ আফ্রিকান এবং অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের একজন করে নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।

দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং প্রবল স্রোতের কারণে নিখোঁজদের সন্ধানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে উদ্ধারকারী দল। দুর্ঘটনাস্থলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নিশ্চিত করাও এখনো কঠিন হয়ে আছে।

উদ্ধারে শত শত কর্মী

চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় উদ্ধার ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করেছে। স্থলবন্দর এলাকায় অন্তত ৫৭৪ জন উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি ও পলির স্তরের মধ্যে নিখোঁজদের সন্ধান করছেন।

তবে অতিরিক্ত পলি ও কাদামাটি উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। কোথাও কোথাও বন্যার পানির পাশাপাশি পাহাড় থেকে নেমে আসা মাটি ও পাথর রাস্তা পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে।

নেপালেও পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার উদ্যোগ

বিপর্যয়ের পর প্রতিবেশী ও অন্যান্য দেশগুলোও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে তারা।

দক্ষিণ কোরিয়াও সরকারি কর্মকর্তা, দমকলকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি দ্রুত-প্রতিক্রিয়া দল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। বিদেশি নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার খবর থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।

গত বছরের ভয়াবহতার পুনরাবৃত্তি

নেপালের রাসুয়া জেলা এর আগেও ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়েছিল। গত বছর চীনের দিকের একটি হিমবাহ বা হিমবাহ-সম্পর্কিত আকস্মিক পানিপ্রবাহের ঘটনায় সৃষ্ট বন্যায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

তবে স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, এবারের দুর্যোগের ব্যাপ্তি গত বছরের তুলনায় আরও বড়। একই সঙ্গে এবারের ঘটনায় সীমান্তবর্তী জনবসতি, বাণিজ্যকেন্দ্র, সড়ক এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

কেন এত ভয়াবহ হলো

হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। পাহাড়ি নদীর উজানে অতিরিক্ত পানি, বরফ গলে যাওয়া, ভূমিধস কিংবা হিমবাহের কোনো অংশ ভেঙে পড়ার মতো ঘটনা খুব অল্প সময়ের মধ্যে নদীর প্রবাহে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় নদীর পানি স্বাভাবিক গতির তুলনায় অনেক বেশি শক্তি নিয়ে নিচের দিকে নেমে আসে। পথে থাকা বসতি, সেতু, রাস্তা কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে ভেসে যেতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলের সংকীর্ণ উপত্যকার কারণে পানির স্রোত আরও বেশি বিধ্বংসী হয়ে ওঠে।

এবারের ঘটনায় ঠিক কোন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় এত বড় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন। ভূমিকম্প, হিমবাহের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি এবং নদীর উজানে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা—সবগুলো বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এখন মূল উদ্বেগ নিখোঁজ মানুষদের উদ্ধার এবং দ্বিতীয় দফার বন্যা ঠেকানো। উজানে জমে থাকা পানি ও ধ্বংসাবশেষ কখন ভেঙে নিচের দিকে নেমে আসবে, তা নিশ্চিত না হওয়ায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।

উদ্ধারকাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগটির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি আরও স্পষ্ট হবে। তবে এরই মধ্যে প্রাণহানি, নিখোঁজের সংখ্যা এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহ ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত