কারাগারে মারা গেলেন ‘বসনিয়ার কসাই’ রাতকো ম্লাদিচ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেদারল্যান্ডসের হেগের কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত সাবেক বসনীয় সার্ব জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার দায়ে ম্লাদিচকে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যাকে বিবেচনা করা হয়।

মৃত্যুর আগে ম্লাদিচের পরিবার তার গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে মুক্তির আবেদন জানিয়েছিল। তবে হেগের সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি কারাগারেই ছিলেন।

১৯৯০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়া ভাঙনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত যুদ্ধের সময় ম্লাদিচ ‘আর্মি অব রিপাবলিক অব স্রপস্কা’-এর নেতৃত্ব দেন। তিনি তৎকালীন যুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচ এবং বসনীয় সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা বসনিয়া যুদ্ধ ছিল ইউরোপের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সংঘাত। এই যুদ্ধে প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত হন এবং ২২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। সংঘাতের সময় বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো ব্যাপক অপরাধ সংঘটিত হয়।

ম্লাদিচের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। সারায়েভো অবরোধকে আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসের দীর্ঘতম সামরিক অবরোধগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় চার বছর ধরে পাহাড়বেষ্টিত শহরটি অবরুদ্ধ থাকায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসহ মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হন। শহরটিতে নিয়মিত গোলাবর্ষণ ও স্নাইপার হামলায় বহু মানুষ নিহত হন।

তবে ম্লাদিচের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার সঙ্গে। ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত স্রেব্রেনিৎসা দখলের পর ম্লাদিচের বাহিনী বসনীয় মুসলিম পুরুষ ও বালকদের হত্যা করে। ৮ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে বিভিন্ন স্থানে গণকবর দেওয়ার ঘটনা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক তদন্তে উঠে আসে।

স্রেব্রেনিৎসা ও আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী হাজার হাজার নারী ও শিশুও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। বহু নারীকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয় এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগও নথিভুক্ত হয়। স্রেব্রেনিৎসার হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বসনিয়া যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ম্লাদিচ দীর্ঘদিন গ্রেপ্তার এড়িয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এ সময় সার্বিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ তাকে আশ্রয় ও সহযোগিতা দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

অবশেষে ২০১১ সালে সার্বিয়ায় গ্রেপ্তার হন ম্লাদিচ। এরপর তাকে নেদারল্যান্ডসের হেগে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালে ট্রাইব্যুনাল তাকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তী আপিলেও সেই সাজা বহাল থাকে।

ম্লাদিচের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বলকান যুদ্ধের অন্যতম কুখ্যাত সামরিক কমান্ডারের জীবনের অবসান হলো। তবে স্রেব্রেনিৎসা ও সারায়েভোতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি এখনও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মানুষের কাছে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।

এদিকে ম্লাদিচের ব্যক্তিগত নথিতে তার জন্মতারিখ নিয়েও গরমিলের তথ্য সামনে এসেছে। তার ছেলে জানিয়েছেন, দাপ্তরিক নথিতে ম্লাদিচের জন্মতারিখ ১২ মার্চ ১৯৪২ উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত জন্মতারিখ ছিল ৮ মার্চ ১৯৪৩।

ম্লাদিচের মৃত্যু তার বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটালেও বসনিয়া যুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধ, বিশেষ করে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা, ইউরোপের ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার এক ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত