ইমরানের ছেলেদের সাক্ষাৎকারে লর্ডস টেস্ট বন্ধের হুমকি

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লর্ডস টেস্টের প্রথম দিনে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) হুমকি দিয়েছিল, স্কাই স্পোর্টস যদি মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে ইমরান খানের দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান খানের সাক্ষাৎকার প্রচার করে, তাহলে লাঞ্চের পর পাকিস্তান দল আর মাঠে ফিরবে না।

ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমাইমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে তার দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান খান। আগে ধারণ করা ওই সাক্ষাৎকারে তারা অভিযোগ করেন, পাকিস্তান সরকার কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির কিংবদন্তি ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খানকে ‘হত্যার চেষ্টা করছে’।

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটন লর্ডসের প্যাভিলিয়নে সাক্ষাৎকারটি নেন। সেখানে ইমরান খানের একটি প্রতিকৃতিও টাঙানো ছিল। ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনের লাঞ্চ বিরতিতে সাক্ষাৎকারটি প্রচারের পরিকল্পনা করেছিল স্কাই স্পোর্টস।

ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিসিবি সাক্ষাৎকারটি প্রচারের বিষয়ে আপত্তি জানায় এবং স্কাই স্পোর্টস প্রথমে সম্প্রচার সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেয়। পরে দুই পক্ষের আলোচনার পর ১৮ মিনিটের সাক্ষাৎকারটি শেষ পর্যন্ত প্রচার করা হয়।

সাক্ষাৎকারটি টেলিভিশনে প্রচারের সময় পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা ইতিমধ্যে বিকেলের সেশনের আগে মাঠের আউটফিল্ডে ওয়ার্ম-আপ করছিলেন। ফলে খেলা বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়েই দ্বিতীয় সেশন শুরু হয় এবং কোনো বিলম্ব ঘটেনি।

পিসিবির বর্তমান চেয়ারম্যান মহসিন নকভি একই সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলে পাকিস্তান সরকারের সমালোচনাকারী ইমরান খানের দুই ছেলেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি পিসিবি কীভাবে দেখেছে, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

ঘটনাটি ক্রিকেটবিশ্বকে ২০০৬ সালের ওভাল টেস্টের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যকার সেই টেস্টের চতুর্থ দিনে আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার ও বিলি ডকট্রোভ বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে পাকিস্তানকে পাঁচ রান পেনাল্টি দেন এবং বল পরিবর্তন করেন।

এর প্রতিবাদে চা-বিরতির পর ইনজামাম-উল-হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দল মাঠে ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে আম্পায়ারেরা ম্যাচটি বাজেয়াপ্ত করে ইংল্যান্ডকে জয়ী ঘোষণা করেন। প্রায় দুই দশক পর লর্ডসে আবারও পাকিস্তানের মাঠে না ফেরার হুমকি ক্রিকেটে সেই বিতর্কিত ঘটনার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।

ইমরান খান পাকিস্তানের হয়ে ৮৮টি টেস্ট খেলেছেন এবং দেশটির অন্যতম সফল ক্রিকেট অধিনায়ক হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২২ সালের এপ্রিলে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি বিভিন্ন মামলায় কারাবন্দি রয়েছেন।

সাক্ষাৎকারে তার দুই ছেলে বাবার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কাসিম ও সুলাইমান জানান, ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে তারা বাবার সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারেননি। সর্বশেষ গত মার্চে ফোনে তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন তারা।

সুলাইমানের দাবি, ইমরান খান এক চোখের প্রায় ৮০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তাকে দিনের প্রায় ২৩ ঘণ্টা একটি ছোট সেলে রাখা হয় এবং গ্রীষ্মকালে সেখানে পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা পাখার ব্যবস্থাও থাকে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। দীর্ঘদিনের একাকী বন্দিত্ব তার রক্তচাপের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে দাবি করেন সুলাইমান।

কাসিম অভিযোগ করেন, কারা কর্তৃপক্ষ ইমরান খানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি নীতি অনুসরণ করছে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় কারাগারে রেখে ইমরানকে রাজনৈতিকভাবে নীরব করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জীবনের বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে ইমরান খান অত্যন্ত শান্ত ও স্থির ছিলেন। এমনকি তার দিকে বন্দুক তাক করা হলেও তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। কিন্তু কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি তাকে শারীরিকভাবে দুর্বল ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে বলে দাবি করেন কাসিম।

গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে ইসলামাবাদের শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল বলে সাক্ষাৎকারে জানানো হয়। তবে সুলাইমানের দাবি, তাকে ওই বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হয় এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে দ্রুত কারাগারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

ইমরানের দুই ছেলে আরও অভিযোগ করেন, তারা একাধিকবার পাকিস্তানে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও বিভিন্ন কারিগরি জটিলতার কথা বলে তাদের ভিসা বন্ধ রাখা হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকাও সমালোচনা করেন তারা। সুলাইমান বলেন, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সহানুভূতি প্রকাশ করলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

কাসিম বলেন, আগের রক্ষণশীল সরকারের সময় তারা কোনো কার্যকর সহায়তা পাননি। তাদের পাকিস্তানে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে গেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না বলেও জানানো হয়েছিল। নতুন লেবার সরকারের আমলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে এবং তারা বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন—এমন প্রত্যাশাও জানান তিনি।

তবে স্কাই স্পোর্টস সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি পাকিস্তান সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও সম্প্রচার করেছে। সরকার ইমরান খানের ওপর নির্যাতন বা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

পাকিস্তান সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ইমরান খান একজন দণ্ডিত কয়েদি হিসেবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় কারাগারে রয়েছেন। তাকে সাতটি সেলসম্বলিত একটি বিশেষ কম্পাউন্ডে রাখা হয়েছে এবং সেখানে শরীরচর্চার সুবিধাও রয়েছে। সরকার আরও জানিয়েছে, তিনি ঘরে রান্না করা খাবার, বই ও টেলিভিশন ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।

সরকারের দাবি, ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৯০০ জনেরও বেশি দর্শনার্থী ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করেছেন। চিকিৎসকেরা তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও ফিট ঘোষণা করার পরই তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন কার্যালয় জানিয়েছে, পাকিস্তানের বিচারিক প্রক্রিয়া দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে যুক্তরাজ্য হস্তক্ষেপ করে না। তবে ব্রিটিশ মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে ইমরান খানের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক বাধ্যবাধকতা রক্ষার জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

লর্ডস টেস্টকে ঘিরে এই ঘটনা ক্রিকেট ও রাজনীতির সংযোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের সম্প্রচারকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান দলের মাঠে না ফেরার হুমকি দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকার প্রচার—দুই ঘটনাই পরিস্থিতির রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা স্পষ্ট করেছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত