সুলিভান ভাইদের হাত ধরে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৯ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফিলাডেলফিয়ার দুই তরুণ রোনান ও ডেকলান সুলিভানের বাংলাদেশি ফুটবলে আসার গল্পটা যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। বাংলাদেশে পা রাখার আগে দেশটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল মূলত পারিবারিক শিকড় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সেই এক বার্তাই শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়ে আসে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলে। আর মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের বিপক্ষে ফাইনালের টাইব্রেকারে রোনানের জয়সূচক পানেনকা শট বাংলাদেশকে এনে দেয় শিরোপা।

রোনান সুলিভানের জন্য মুহূর্তটি ছিল আরও বিশেষ। অনুশীলনে জীবনে মাত্র দুবার পানেনকা শট নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। দুবারের একটি শট আবার ক্রসবারে লেগেছিল। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে ফাইনালের টাইব্রেকারে পঞ্চম ও জয়সূচক পেনাল্টি নেওয়ার আগে যমজ ভাই ডেকলানকে নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে হয়নি। ডেকলান জানতেন, রোনান এমন পরিস্থিতিতে কী করতে চাইবেন।

৩ এপ্রিল মালদ্বীপের মালের স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের সামনে রোনানের চিপ শট নিখুঁতভাবে জালে জড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের উল্লাসের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে দুই ভাইয়ের নাম।

রোনান পরে বলেন, পরিস্থিতি এমনভাবে শেষ হবে—এ কথা কেউ আগে বললে তিনি বিশ্বাসই করতেন না।

বাংলাদেশের ফুটবলে সুলিভান ভাইদের যাত্রার শুরু অবশ্য আরও আগে। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি ফ্যান পেজের মাধ্যমে ইনস্টাগ্রামে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে কাজ করা ওই পেজ থেকেই তাদের অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রথমে বিষয়টি রোনান ও ডেকলানের কাছে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। পাসপোর্ট পাওয়ার আগেই এমন একটি প্রস্তাব পাওয়ায় তারা বিভ্রান্তও হয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন, পেজটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অনুমোদিত মাধ্যম। এরপর সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে খেলার আগ্রহ জানালে বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিমের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর শুরু হয় জটিল প্রস্তুতি। দুই ভাইয়ের মা বাংলাদেশি হলেও তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট না থাকায় যোগ্যতা ও ভ্রমণসংক্রান্ত প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় পৌঁছান রোনান ও ডেকলান। এটিই ছিল তাদের জীবনের দীর্ঘতম সফর।

ঢাকায় এসে অবশ্য কোনো বিশেষ সুবিধা পাননি তারা। ৩০ জনের বেশি খেলোয়াড় নিয়ে শুরু হওয়া ক্যাম্পে নিজেদের জায়গা করে নিতে হয়েছে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে। দলে প্রবাসী আরও কয়েকজন খেলোয়াড় থাকলেও মাঠের ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

রোনানের ভাষায়, বিদেশ থেকে আসা খেলোয়াড়দের শুরুতে দলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সমস্যা হয়। ভাষা না বোঝার কারণে বল পাওয়া কঠিন হতে পারে, আবার দলের অন্য খেলোয়াড়রাও শুরুতে নতুন কাউকে সহজভাবে গ্রহণ নাও করতে পারেন। কিন্তু কয়েকবার বল পেয়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারলেই পরিস্থিতি বদলে যায়।

সুলিভান ভাইদের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। কয়েক দিনের অনুশীলনের পর তারা চূড়ান্ত দলে জায়গা পাওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং সতীর্থদের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

চার ভাইয়ের ফুটবল

রোনান ও ডেকলানই শুধু ফুটবলার নন। তাদের অন্য দুই ভাই কোয়েন ও ক্যাভানও ফুটবলে পরিচিত মুখ। দুজনেই ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের অ্যাটাকার। কোয়েন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের মূল স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছেন, আর ক্যাভান আমেরিকান ফুটবলের অন্যতম আলোচিত তরুণ প্রতিভা হিসেবে উঠে আসছেন।

চার ভাইয়েরই যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও বাংলাদেশের হয়ে খেলার যোগ্যতা রয়েছে। ফলে রোনান ও ডেকলানের বাংলাদেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত দেশটির জন্য প্রবাসী প্রতিভা কাজে লাগানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ডেকলানের মতে, তাদের অভিজ্ঞতা দেখে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ ফুটবলাররাও এখন জাতীয় দলের হয়ে খেলার বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন। ইংল্যান্ডের একাডেমিতে খেলা কয়েকজন তরুণও বাংলাদেশের হয়ে খেলার আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশের ফুটবলে প্রবাসী প্রতিভা খোঁজার এই উদ্যোগের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছেন জাতীয় দলের কোচ থমাস ডুলি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় ফুটবলার ডুলি জার্মানিতে বেড়ে ওঠেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে খেলেন। কোচিং ক্যারিয়ারের বড় একটি অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কাটানোর পর এখন বাংলাদেশের জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।

ডুলি মনে করেন, বাংলাদেশকে শুধু ফুটবল সমর্থকদের দেশ হয়ে থাকলে চলবে না; নিজেদের ফুটবল খেলার দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ডুলি ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, বিদেশে বেড়ে ওঠা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থাকা খেলোয়াড়রা স্থানীয় ফুটবলারদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারেন। লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তাঁর আগমন দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করেছে।

তবে ডুলি একই সঙ্গে সতর্ক। বিদেশে থাকা প্রতিটি খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে আনার প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, এমন খেলোয়াড়কেই দলে নেওয়া উচিত, যিনি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের দলকে শক্তিশালী করতে পারবেন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল খেলার ভিডিও পাঠালেই কাউকে জাতীয় দলের উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

তিনি বরং মনে করেন, কোনো খেলোয়াড়কে আনার পেছনে কয়েক হাজার ডলার খরচ করার বদলে একই অর্থ স্থানীয় খেলোয়াড়দের জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণে ব্যয় করলে দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুফল পাওয়া যেতে পারে।

বিশ্বকাপের স্বপ্ন

বাংলাদেশের ফিফা র‌্যাঙ্কিং দীর্ঘদিন ধরেই নিচের দিকে। তবু ডুলি বিশ্বাস করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর ঘরে ওঠা সম্ভব। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন সেখানেই থেমে নেই।

বাংলাদেশের জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বিশ্বকাপের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, দলকে উন্নত করতে হলে জাতীয় দলের সাফল্যের পাশাপাশি যুব পর্যায়ে শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একাডেমি থেকে খেলোয়াড় উঠে আসবে, তারা ঘরোয়া লিগে খেলবে এবং সেখান থেকে জাতীয় দলের জন্য মানসম্পন্ন ফুটবলার তৈরি হবে—এমন একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সুলিভান ভাইরাও সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করেন। চার ভাইয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু বছর ধরেই বাংলাদেশি পতাকার উপস্থিতি দেখা যায়। মালদ্বীপে থাকার সময় তারা অনলাইনে বাংলাদেশের সমর্থকদের উন্মাদনা দেখেছেন। বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচকে ঘিরে দুই দেশের সমর্থকদের উত্তেজনা তাদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।

ঢাকায় শিরোপা নিয়ে ফেরার পরও সেই উন্মাদনা কমেনি। ফুল, সংবর্ধনা আর মানুষের ভালোবাসায় কয়েক দিন কেটেছে তাদের। রাস্তায় বের হলেও মানুষ তাদের চিনে ফেলছিলেন।

ডেকলানের কাছে বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের যুব ফুটবলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি ট্রফি দেশের মানুষের মধ্যে যে আবেগ তৈরি করতে পারে, সেটি তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন।

এখন লক্ষ্য আরও বড়। সম্ভাব্য নতুন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় হিসেবে ডেকলান তাঁর বন্ধু ও পেন স্টেটের উইঙ্গার নেহান হাসান এবং স্ট্যানফোর্ডের স্ট্রাইকার ট্রেভর ইসলামের নাম উল্লেখ করেছেন। ডুলি আবার ফুলহাম একাডেমির ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ফারহান ওয়াহিদ এবং ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের লিগে খেলা লুই ওয়াটসনের মতো খেলোয়াড়দেরও নজরে রাখছেন।

আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় সিনিয়র সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হবে ডুলির সামনে বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০০৩ সালে, তাও স্বাগতিক হিসেবে, এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জিতেছিল। এবার সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তিই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

এর পরের লক্ষ্য আরও দীর্ঘমেয়াদি—বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতিই বদলে দেওয়া। ডুলি চান, দেশের শিশুরা শুধু আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সমর্থক হওয়ার স্বপ্ন দেখবে না; বরং একদিন নিজেরাই সেই দলগুলোর বিপক্ষে খেলতে চাইবে।

রোনানও মনে করেন, বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে দেশজুড়ে অভূতপূর্ব উদযাপন হবে। ডেকলানের কাছে এটি শুধু একটি কল্পনা নয়; বরং সঠিক খেলোয়াড়দের বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুঁজে এনে জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে অর্জনযোগ্য একটি লক্ষ্য।

বাংলাদেশের ফুটবলের সামনে পথটি দীর্ঘ এবং কঠিন। কিন্তু সুলিভান ভাইদের মতো প্রবাসী প্রতিভা, হামজা চৌধুরীর মতো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় এবং থমাস ডুলির মতো পরিকল্পনাবিদ কোচের সমন্বয়ে সেই পথের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ শিরোপা হয়তো সেই যাত্রার শুরু মাত্র।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত