আমিনবাজারের বর্জ্য থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
আমিনবাজারের বর্জ্য থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার প্রতিদিনের হাজার হাজার টন বর্জ্য, যা এতদিন নগরবাসীর জন্য বড় ধরনের পরিবেশগত ও ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে ছিল, এবার সেই বর্জ্য থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। রাজধানীর আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিনিয়োগ করছে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পৌর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় ৪২ থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে সরকার নির্ধারিত মূল্যে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, বর্জ্য থেকে উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন বক্তব্যে ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর প্রত্যাশার কথাও জানানো হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী প্রকল্পটির অগ্রগতি ও বিদ্যুৎ কেনার মূল্য সম্পর্কে জানান। তিনি বলেন, চীনা কোম্পানি আমিনবাজার ল্যান্ডফিল ব্যবহার করে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন পৌর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে বলে আগে সরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন বৈঠকে জানানো হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ দীর্ঘমেয়াদি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নয়; ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত থাকার লক্ষ্যেই প্রকল্পটি সাজানো হয়েছে।

প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি আগামী ২ সেপ্টেম্বর চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে সই হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে সমঝোতা ও চুক্তির কাজ এগিয়েছে। পরবর্তী ধাপে বিনিয়োগকারী ব্যাংক, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোম্পানি এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে অর্থায়নসংক্রান্ত চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার প্রস্তাব সাধারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বেশি। সরকারি কর্মকর্তারাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। দেশে নিজস্ব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও ক্যাপাসিটি চার্জসহ উৎপাদন ব্যয় ১২ থেকে ১৪ টাকার মধ্যে থাকার কথা বলা হয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার গড় দামও ২৫ টাকার তুলনায় কম।

তাহলে তুলনামূলক বেশি দামে বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ কেনার কারণ কী—এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মনে করছেন, শুধু বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য দিয়ে প্রকল্পটির লাভ-ক্ষতি বিচার করা ঠিক হবে না। কারণ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীর বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হবে। বর্তমানে যে বর্জ্য ল্যান্ডফিলে জমা হচ্ছে, তা প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অবশিষ্ট অংশ থেকে জৈবসারসহ বিভিন্ন উপাদান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। চীনা কোম্পানি নিজস্ব বিনিয়োগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে এবং ল্যান্ডফিল ব্যবহারের জন্য সিটি করপোরেশনকে মাসিক ভাড়া দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ সরকারের মূল ব্যয়ের চাপ ছাড়াই একটি বড় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো তৈরি এবং সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশগত ও আর্থিক প্রশ্নও রয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বর্জ্য পোড়ানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে নির্গমন নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ও কঠোর পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। বর্জ্যের মধ্যে প্লাস্টিক, ভারী ধাতু ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান থাকলে সেগুলো পোড়ানোর ফলে বায়ুদূষণ বা ক্ষতিকর ছাই তৈরির ঝুঁকি থাকতে পারে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ নয়, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, ছাই ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাবে।

এ ছাড়া প্রকল্পটির কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণ বর্জ্য সরবরাহের ওপর। প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কমে যেতে পারে। আবার প্রকল্পের চুক্তিতে বর্জ্য সরবরাহের দায়, ঘাটতি হলে ক্ষতিপূরণ এবং সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব কী হবে—এসব বিষয়ও বাস্তবায়নের আগে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন নগরীতে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে ল্যান্ডফিলে জমা হয়। এতে পরিবেশগত চাপ বাড়ে, দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে ল্যান্ডফিলের জমির ওপর চাপও ক্রমেই বাড়ছে। এই বর্জ্যের একটি অংশ যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদনের দুটি সমস্যা মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হবে।

সরকার ঢাকার দক্ষিণ অংশেও একই ধরনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের একটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। চীনের পাওয়ারচায়না নামের একটি প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাতুয়াইলের বর্জ্য থেকেও ভবিষ্যতে ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে ঢাকার বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আগেই আলোচনা হয়েছে। আমিনবাজার ও মাতুয়াইল—দুই প্রকল্পই দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।

আমিনবাজার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। প্রতিদিনের আবর্জনা তখন শুধু ফেলে দেওয়ার বস্তু হিসেবে বিবেচিত না হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সম্ভাব্য সম্পদে পরিণত হবে। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পের প্রযুক্তি কতটা পরিবেশবান্ধব, বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটা নির্ভরযোগ্য, বর্জ্য সরবরাহ কতটা নিয়মিত এবং চুক্তির আর্থিক শর্ত কতটা জনস্বার্থসম্মত তার ওপর।

২৫ টাকা ইউনিট দরে বিদ্যুৎ কেনার বিষয়টি তাই একদিকে যেমন ব্যয়ের প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সুবিধার সম্ভাবনাও সামনে আনছে। সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে—বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুফল নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেন অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবেশদূষণ বা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি না হয়। সঠিক প্রযুক্তি, কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছ চুক্তি নিশ্চিত করা গেলে আমিনবাজারের এই উদ্যোগ ঢাকার দীর্ঘদিনের বর্জ্য সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত